বাংলাদেশে “মুনাজাত” বলতে সাধারণত হাত তুলে দোয়া করা বোঝায়, বিশেষ করে নামাযের পরে ইমামের সাথে সবাই মিলে। হাত তুলে দোয়া করা নিঃসন্দেহে সুন্নাহ। তবে কোন সময় কীভাবে, তা জানা দরকার, যাতে সুন্নাহর ওপর থাকা যায় আর অপ্রয়োজনীয় বিবাদ এড়ানো যায়।
হাত তুলে দোয়া: সুন্নাহ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু ক্ষেত্রে হাত তুলে দোয়া করেছেন, এবং এ সংক্রান্ত হাদীসগুলো এত বেশি যে আলিমগণ বিষয়টিকে অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির (অসংখ্য সূত্রে প্রমাণিত) বলেছেন। কয়েকটি উদাহরণ:
- বৃষ্টির জন্য দোয়ায় তিনি এত উঁচু করে হাত তুলতেন যে বগলের শুভ্রতা দেখা যেত। (বুখারী ১০৩১, মুসলিম ৮৯৫)
- বদর যুদ্ধের আগে কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দীর্ঘ দোয়া করেছেন। (মুসলিম ১৭৬৩)
- হজে প্রথম ও মধ্যম জামরায় কংকর মারার পর কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দোয়া করেছেন। (বুখারী ১৭৫১)
- মক্কা বিজয়ের দিন সাফা পাহাড়ে উঠে হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করেছেন। (মুসলিম ১৭৮০)
- কারও জন্য দোয়ায়: ওযু করে হাত তুলে আবু আমিরের জন্য দোয়া। (বুখারী ৪৩২৩)
তাই নামাযের বাইরে যেকোনো সময় একা হাত তুলে দোয়া করা সুন্নাহসম্মত।
যেসব জায়গায় হাত তোলা হয় না
যেসব দোয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দিষ্ট কাজের সাথে পড়তেন অথচ হাত তুলেছেন বলে প্রমাণ নেই, সেখানে হাত তোলা হয় না। যেমন: খাওয়ার আগে-পরে, ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়া, টয়লেটে যাওয়া, নামাযের ভেতরের দোয়া (সিজদা, তাশাহহুদের পর), জুমআর খুতবার সময় খতীবের সাধারণ দোয়া (বৃষ্টির দোয়া ছাড়া)। (খুতবায় হাত তোলার ব্যাপারে মুসলিম ৮৭৪-এর ঘটনা দেখুন)
ফরয নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত
ফরয নামাযের সালামের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ যা নিয়মিত করতেন তা হলো মাসনূন যিকির: তিনবার ইস্তিগফার, “আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম…”, তাসবীহ-তাহমীদ-তাকবীর, আয়াতুল কুরসী ইত্যাদি। এগুলো এই সাইটের যিকির ও আযকার ভাগে আছে।
তবে প্রতি ফরয নামাযের পর ইমাম ও মুক্তাদিরা একসাথে হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাত করেছেন, এমন কোনো নিয়মিত আমল রাসূলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবীদের থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। এ বিষয়ে আলিমদের অবস্থান মোটামুটি এরকম:
- অনেক আলিম বলেন, একে প্রতি নামাযের অপরিহার্য অংশ বানানো, না করলে নিন্দা করা, বা একে নামাযের অংশ মনে করা বিদআত। শাইখ ফায়সাল আল-বা‘দানীর “দো‘আ-মোনাজাত: কখন ও কীভাবে?” গ্রন্থে বলা হয়েছে: নামাযের পরের দোয়াগুলো প্রমাণিত, এর বেশিরভাগের আসল স্থান সালামের আগে; প্রতি ফরযের পর নিয়মিত সম্মিলিত মুনাজাত সুন্নাহয় পাওয়া যায় না; তবে নামাযের পর একাকী দোয়া, বা বিশেষ কোনো উপলক্ষে সম্মিলিত দোয়া জায়েয।
- উপমহাদেশের কিছু হানাফী আলিম ফরযের পর দোয়া কবুলের হাদীস এবং হাত তোলার সাধারণ হাদীসের ভিত্তিতে মাঝে মাঝে সম্মিলিত দোয়াকে জায়েয বলেছেন, তবে তাঁরাও একে আবশ্যক মনে করা বা না করলে নিন্দা করাকে ভুল বলেছেন।
আমাদের পরামর্শ
- সালামের পর প্রথমে মাসনূন যিকিরগুলো পড়ুন। এটাই প্রমাণিত সুন্নাহ।
- এরপর নিজের প্রয়োজনে একাকী, অর্থ বুঝে দোয়া করুন; চাইলে হাত তুলে।
- মসজিদে সম্মিলিত মুনাজাত হলে বিবাদ বা ঝগড়ায় যাবেন না। নম্রতা, হিকমাহ ও ইলমের সাথে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করুন। ঐক্য রক্ষা করাও দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
- দোয়ার আসল কথা অন্তরের উপস্থিতি। হাত তোলা বা না তোলার চেয়ে মন দিয়ে আল্লাহর কাছে চাওয়া বেশি জরুরি।
অন্য সময়ের সম্মিলিত দোয়া
বৃষ্টির নামায, কুনূতে নাযিলাহ (বিপদের সময় নামাযে কুনূত), ইমামের দোয়ায় মুক্তাদিদের আমীন বলা: এগুলো হাদীসে প্রমাণিত। কোনো মজলিসে কেউ দোয়া করলে অন্যরা আমীন বলা জায়েয। কিন্তু কোনো সম্মিলিত দোয়ার নির্দিষ্ট সময়, পদ্ধতি বা সংখ্যা নিজেরা নির্ধারণ করে তাকে সুন্নাহ বলা ঠিক নয়।