রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু দোয়ার শব্দই শেখাননি, কীভাবে চাইতে হয় তাও শিখিয়েছেন। এই আদবগুলো দোয়াকে সুন্দর করে এবং কবুলের আশা বাড়ায়। এর কোনোটিই বাধ্যতামূলক শর্ত নয়: আদব ছাড়াও দোয়া করা যায়, তবে আদবসহ করা উত্তম।
১. হামদ ও দরূদ দিয়ে শুরু
ফাদালা ইবনে উবাইদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তিকে নামাযে দোয়া করতে শুনলেন, যে আল্লাহর প্রশংসা করেনি এবং নবীর ওপর দরূদও পড়েনি। তিনি বললেন: “এ তাড়াহুড়ো করেছে।” তারপর বললেন: “তোমাদের কেউ দোয়া করলে প্রথমে তার রবের প্রশংসা ও গুণগান করবে, তারপর নবীর ওপর দরূদ পড়বে, তারপর যা ইচ্ছা চাইবে।” (তিরমিযী ৩৪৭৭, আবু দাউদ ১৪৮১; সহীহ)
দরূদের জন্য দেখুন: দরূদে ইবরাহীম।
২. আল্লাহর নাম ও গুণের উসিলায় চাওয়া
আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ; সুতরাং তোমরা সেসব নামে তাঁকে ডাকো।
সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৮০
ক্ষমা চাইলে “ইয়া গাফূর”, রিযিক চাইলে “ইয়া রাযযাক”, রহমত চাইলে “ইয়া রাহমান”: চাওয়ার সাথে মিল রেখে আল্লাহর নাম নেওয়া কুরআনের শিক্ষা। নিজের নেক আমলের উসিলায় চাওয়াও সহীহ হাদীসে আছে: গুহায় আটকে পড়া তিন ব্যক্তির ঘটনা। (বুখারী ২২৭২, মুসলিম ২৭৪৩)
৩. হাত তোলা
দোয়ায় দুই হাত তোলা সুন্নাহ। বহু হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাত তুলে দোয়ার কথা এসেছে, আর আল্লাহ হাত তোলা বান্দাকে খালি হাতে ফেরাতে লজ্জাবোধ করেন। (আবু দাউদ ১৪৮৮, তিরমিযী ৩৫৫৬; সহীহ) কখন হাত তুলবেন আর কখন নয়, তা নিয়ে বিস্তারিত: মুনাজাত: কখন ও কীভাবে।
৪. বিনয়, ভয় ও আশা নিয়ে, চুপিসারে
তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনয়ের সাথে ও চুপিসারে।
সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৫৫
এক সফরে সাহাবীরা উঁচু স্বরে তাকবীর দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “নিজেদের ওপর দয়া করো। তোমরা কোনো বধির বা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না; তোমরা ডাকছ সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী সত্তাকে।” (বুখারী ৪২০৫, মুসলিম ২৭০৪)
৫. দৃঢ়ভাবে চাওয়া, বারবার চাওয়া
“আপনি চাইলে দিন” না বলে দৃঢ়ভাবে চাইবেন। (বুখারী ৬৩৩৮) ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ দোয়া করলে তিনবার করতেন, আর চাইলে তিনবার চাইতেন। (মুসলিম ১৭৯৪)
৬. নিজের জন্য আগে, তারপর অন্যের জন্য
উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কাউকে স্মরণ করে তার জন্য দোয়া করলে প্রথমে নিজের জন্য দোয়া করতেন। (তিরমিযী ৩৩৮৫; সহীহ) নবীদের দোয়াতেও এই ধারা দেখা যায়, যেমন: “হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে ও মুমিনদের ক্ষমা করুন।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪১)
৭. পবিত্র অবস্থায়, কিবলামুখী হয়ে
ওযু ছাড়াও দোয়া করা যায়। তবে পবিত্র অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা উত্তম। আবু মূসা আশআরী (রা.)-এর ঘটনায় আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ পানি চেয়ে ওযু করলেন, তারপর হাত তুলে আবু আমিরের জন্য দোয়া করলেন। (বুখারী ৪৩২৩) বৃষ্টির জন্য দোয়ায় তিনি কিবলামুখী হয়েছিলেন। (বুখারী ১০১২)
৮. গুনাহ স্বীকার ও নিজের দুর্বলতা প্রকাশ
নবীদের দোয়ায় অক্ষমতা ও ভুল স্বীকারের কথা বারবার এসেছে। আদম (আ.): “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি…” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৩) ইউনুস (আ.): “…নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭)
৯. দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই চাওয়া
আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সবচেয়ে বেশি যে দোয়া করতেন তা হলো “রব্বানা আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাহ…”। (বুখারী ৬৩৮৯, মুসলিম ২৬৯০) দেখুন: রব্বানা আতিনা।
দোয়ার শেষে মুখে হাত বোলানো
দোয়ার পর দুই হাত মুখে বোলানোর ব্যাপারে যে হাদীসগুলো আছে, সেগুলোর সনদ দুর্বল। কিছু আলিম দুর্বল বর্ণনাগুলো একসাথে মিলিয়ে একে জায়েয বলেছেন, আর অনেকে বলেছেন এটি প্রমাণিত সুন্নাহ নয়। তাই এ নিয়ে কঠোরতা বা বিতর্কের দরকার নেই: করলে নিষেধ করা হবে না, তবে সুন্নাহ হিসেবে জোর দেওয়া যাবে না।