duabd

লেখা

সার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রাম

সমস্যা কয়েক রকম, বুঝতে পারছেন না কোন রুকইয়াহ লাগবে? প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ ও প্রতি মাসের একটি সাধারণ রুকইয়াহ রুটিন।

অনেকের সমস্যা একাধিক রকম: কিছু লক্ষণ বদনজরের মতো, কিছু জাদুর, কিছু জিনের। প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা রুকইয়াহর নিয়ম মানতে গিয়ে অনেকে দিশা হারিয়ে ফেলেন। তাদের জন্য একটি সহজ, সার্বজনীন রুটিন হলো এই “Common Full Ruqyah Program”। উস্তায মুহাম্মাদ তিম হাম্বলের একটি প্রবন্ধের ভিত্তিতে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ এটি নিজের ভাষায় সাজিয়েছেন।

জাদু, জিন, বদনজর, কিংবা সাধারণত যেসব সমস্যায় রুকইয়াহ করা হয়, সবগুলোতেই এটি অনুসরণ করা যায়। যাদের সমস্যা বহুমুখী এবং ঠিক কী করা উচিত বুঝতে পারছেন না, তারা আলাদা আলাদা রুকইয়াহর বদলে শুধু এই রুটিনটি ধরে রাখলেও যথেষ্ট উপকার আশা করা যায়, ইন শা আল্লাহ।

এই রুটিন ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি চলবে, বদলে নয়। চলমান ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না। প্রতিটি শারীরিক বা মানসিক সমস্যাকে জাদু-জিন ভেবে নেওয়াও ঠিক নয়; উপসর্গ গুরুতর হলে আগে ডাক্তার দেখান।

শুরুর আগে: যিনি রুকইয়াহ করবেন

  1. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখবেন; আরোগ্য একমাত্র তাঁরই হাতে।
  2. প্রতিদিনের ফরয-ওয়াজিব ইবাদত অবশ্যই আদায় করবেন, আর যতটা সম্ভব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর প্রতি যত্নবান থাকবেন।
  3. প্রতিদিনের মাসনূন আমল গুরুত্ব দিয়ে করবেন এবং ধীরে ধীরে সেগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করবেন।
  4. সাথে কোনো তাবিজ রাখবেন না। আগে ব্যবহার করা তাবিজ থাকলে জাদু অধ্যায়ে বলা নিয়মে নষ্ট করবেন (দেখুন জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ)।
  5. ঘর যতটা সম্ভব পবিত্র রাখবেন। প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য, কুকুর বা এমন কিছু রাখবেন না, যা রহমতের ফেরেশতাদের প্রবেশে বাধা দেয় এবং শয়তানকে জায়গা করে দেয়।
  6. সমস্যা পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্যের সাথে রুকইয়াহ চালিয়ে যাবেন।
  7. যথাসম্ভব গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করবেন, আর সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করবেন।

প্রতিদিন যা করবেন

১. সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল

এগুলো সঠিকভাবে ও নিয়মিত করুন। পূর্ণ তালিকা, কোনটা কতবার, দেখুন জাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমল।

অনেক বোন পিরিয়ডের দিনগুলোতে মাসনূন আমল ছেড়ে দেন। এটা মোটেও ঠিক নয়; বরং ওই সময় শয়তান থেকে বাঁচার আমলগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত। লেখকের মতে, পিরিয়ডের সময় কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া অন্যান্য দোয়া-যিকির পড়তে কোনো বাধা নেই।

২. কমপক্ষে পৌনে এক ঘণ্টা তিলাওয়াত

রুকইয়াহর নিয়তে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪৫ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত করুন; সম্ভব হলে আরও বেশি।

৩. ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার

প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার করুন, যেমন “আস্তাগফিরুল্লাহ”। নামাযে অবহেলা থাকলে প্রতি ফরয নামাযের পর ২০ বার করে পড়ার অভ্যাস করতে পারেন; এতে দিনে ১০০ বার হয়ে যায়, নামাযও নিয়মিত হয়।

৪. সুস্থতার জন্য দোয়া

প্রতিদিনই আল্লাহর কাছে আরোগ্য চান: নিজের ভাষায়, মন থেকে। হাদীসের দোয়াও পড়তে পারেন, যেমন আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ।

প্রতি সপ্তাহে যা করবেন

বাড়িতে সপ্তাহে অন্তত এক দিন পুরো সূরা আল-বাকারা (সূরা আল-বাকারা (২)) তিলাওয়াত করুন। উত্তম হলো প্রতি তিন দিনে একবার পড়া।

  • সবচেয়ে ভালো, সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজেই পড়বেন।
  • তা সম্ভব না হলে অন্য কেউ তিলাওয়াত করবেন, আর তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন।
  • নিজে পড়তে না পারলে এবং পড়ে শোনানোর মতো কাউকেও না পেলে অপারগতার কারণে অডিও শোনা যায়। কিন্তু তিলাওয়াত করা সম্ভব হলে তিলাওয়াতই করা উচিত।

প্রতি মাসে যা করবেন

মাসে অন্তত একবার, আর সমস্যা বেশি হলে দুই বার আল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্স করুন। এক সপ্তাহ ডিটক্স করার পর এক থেকে দেড় সপ্তাহ বিরতি দিয়ে তারপর আবার করা ভালো। বিরতি ছাড়া লাগাতার ডিটক্স করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

মাঝেমধ্যে যা করবেন

হিজামা

রুকইয়াহ থেকে সর্বোত্তম ফল পেতে মাঝেমধ্যে হিজামা করানো উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা যেসব চিকিৎসা গ্রহণ করো, তার মধ্যে হিজামা সবচেয়ে উত্তম (বুখারী)। তিনি নিজেও বিভিন্ন অসুস্থতায় হিজামা করিয়েছেন, এমনকি জাদু থেকে মুক্ত হওয়ার পর ভালোভাবে সেরে ওঠার জন্যও। অনেকের ক্ষেত্রে রুকইয়াহর সাথে হিজামা যুক্ত করার পরই পূর্ণ সুস্থতা আসে। তাই জাদু-জিন সংক্রান্ত সমস্যার হিজামায় অভিজ্ঞ, দ্বীনদার কারও সাহায্য নিন।

হিজামা একটি শারীরিক প্রক্রিয়া, তাই প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে এবং জীবাণুমুক্ত সরঞ্জামে করান। মহিলারা মহিলা থেরাপিস্টের কাছেই করাবেন। রক্তস্বল্পতা, রক্ত পাতলা করার ওষুধ, গর্ভাবস্থা বা কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুখ থাকলে আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

নিয়মিত আপডেট জানানো

এই দীর্ঘ রুটিন যারা অনুসরণ করবেন, তারা হাতের কাছে একটি খাতা বা ডায়েরি রাখুন। প্রতিদিনের অবস্থা এক-দুই লাইনে লিখে রাখুন। কিছুদিন পরপর যিনি আপনাকে রুকইয়াহর ব্যাপারে গাইড করছেন তাকে, অথবা রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপে, আপনার অবস্থা জানান।

মোট কথা, নিজের সার্বিক অবস্থা নিয়ে অভিজ্ঞ কারও সাথে নিয়মিত পরামর্শ করুন, এবং সেই অনুযায়ী রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়া, বন্ধ করা বা পরিকল্পনা বদলানোর সিদ্ধান্ত নিন।

এক নজরে পুরো রুটিন

  • প্রতিদিন: সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল; রুকইয়াহর নিয়তে কমপক্ষে ৪৫ মিনিট তিলাওয়াত (শুধু অডিও হলে দ্বিগুণ সময়); ৭০–১০০ বার ইস্তিগফার; সুস্থতার দোয়া; খাতায় এক-দুই লাইনে অবস্থা লেখা।
  • প্রতি সপ্তাহে: বাড়িতে অন্তত একবার পুরো সূরা বাকারা; উত্তম হলো প্রতি তিন দিনে একবার।
  • প্রতি মাসে: ১ বার (সমস্যা বেশি হলে ২ বার) সাত দিনের আশফিয়া ডিটক্স; দুইবারের মাঝে ১–১.৫ সপ্তাহ বিরতি।
  • মাঝেমধ্যে: হিজামা; অভিজ্ঞ কাউকে অবস্থার আপডেট জানানো।

কতদিন চালাবেন

সমস্যা পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত। কারও কয়েক সপ্তাহে কাজ হয়, কারও কয়েক মাস লেগে যায়; সমস্যার গভীরতা অনুযায়ী সময় কম-বেশি হয়। একটু ভালো লাগলেই রুকইয়াহ ছেড়ে দেওয়া রোগীদের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। আবার কয়েক মাস ঠিকমতো করেও কোনো পরিবর্তন না হলে নিজের পদ্ধতি, আমল ও জীবনযাপন যাচাই করা দরকার। বিস্তারিত পড়ুন রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা।

কবিরাজ, তান্ত্রিক বা “জিন হাজির করে” চিকিৎসা দেওয়া কারও কাছে যাবেন না। তাবিজ-কবচ, সংখ্যা বা নকশার “আমল”, অদৃশ্যের খবর দেওয়ার দাবি, কিংবা জাদু দিয়ে জাদু কাটানো (নুশরা): এসব হারাম এবং ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। কুরআন, সহীহ দোয়া আর বৈধ চিকিৎসাই যথেষ্ট।

সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ২৪৩–২৫১), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।

আরও পড়ুন

রুকইয়াহ কী?রুকইয়াহ শারইয়্যাহর অর্থ, জায়িয হওয়ার তিন শর্ত, রুকইয়ার তিন স্তর, জরুরি পরিভাষা এবং কেন প্রত্যেক পরিবারে কারো না কারো রুকইয়াহ জানা দরকার।লেখাসুন্নাহসম্মত রুকইয়াহর ১০টি পদ্ধতিশুধু তিলাওয়াত, হাত রেখে পড়া, ফুঁ, হালকা থুতু, হাত বুলানো, পানি-লবণ, মাটি ও টানা কয়েক দিন: হাদীসে আসা রুকইয়ার দশটি পদ্ধতি ও প্রয়োগের নিয়ম।লেখারুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদানরুকইয়ার আগে ঘর ও মন প্রস্তুত করা, রুকইয়ার পানি, যমযম, মধু, কালোজিরা, বরই পাতা, রুকইয়ার গোসলের নিয়ম এবং রুকইয়ার অডিও নিয়ে জরুরি প্রশ্নোত্তর।লেখানিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?সত্তর হাজারের হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা, কখন নিজে আর কখন অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ করাবেন, ভালো রাক্বীর বৈশিষ্ট্য এবং জাদুকর কবিরাজ চেনার লক্ষণ।লেখারুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝারুকইয়ার পর ক্লান্তি, ব্যথা বা বমি হলে কী করবেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন, সুস্থ হতে কেন দেরি হয় এবং কীভাবে বুঝবেন রুকইয়াহ সত্যিই শেষ।লেখাবদনজর: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসাবদনজর সত্য, তবে এর চিকিৎসা সহজ। লক্ষণ, প্রতিদিনের সুরক্ষা আর ওযুর পানি, দোয়া ও রুকইয়ার গোসলসহ চারটি পদ্ধতি ধাপে ধাপে।লেখাজিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসাজিনের আসর কেন ও কখন হয়, কীভাবে চিনবেন ও বাঁচবেন, আর কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতিতে কীভাবে রুকইয়াহ করবেন: শান্ত ও বিস্তারিত নির্দেশনা।লেখাবাড়িতে জিনের সমস্যা হলেবাড়িতে অস্বাভাবিক আওয়াজ, ছায়া বা জিনিস সরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে কী করবেন: কারণ, পাঁচটি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি ও পরে যা মেনে চলবেন।লেখাজাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহজাদুর বাস্তবতা, ধরন ও লক্ষণ, জাদুকর কবিরাজ চেনার উপায়, তাবিজ ও জাদুর জিনিস নষ্টের নিয়ম এবং জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ ও প্রেসক্রিপশন।লেখাবিভিন্ন ধরনের জাদুর রুকইয়াহবিয়ে আটকানো, বিচ্ছেদ, বশ করা, পাগল বানানো, বান মারা, ইস্তিহাযা, সহবাসে অক্ষমতা ও গর্ভপাতের জাদু: প্রতিটির লক্ষণ ও দিনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন।লেখাওয়াসওয়াসা রোগ: মুক্তির উপায়ওযু-নামায নিয়ে সন্দেহ, ঈমান নিয়ে অবাঞ্ছিত চিন্তা বা কুমন্ত্রণা? পাত্তা না দেওয়ার কৌশল, মাসনূন দোয়া, রুকইয়াহ ও কখন ডাক্তার দেখাবেন।লেখাসাধারণ অসুস্থতায় রুকইয়াহব্যথা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা, চোখ, তোতলামি, শ্বাসকষ্ট, হাড়ক্ষয় ও ক্লান্তিতে ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত রুকইয়ার নিয়ম।লেখাশিশুদের রুকইয়াহশিশুর রুকইয়াহ সহজ: কোলে নিয়ে মাথায় হাত রেখে মাসনূন দোয়া ও তিন কুল। তাবিজ-টিপ ছাড়া সুরক্ষা, কখন বদনজর, আর যা কখনো করবেন না।লেখাআল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্সপানি, অলিভ অয়েল, মধু ও কালোজিরায় রুকইয়াহ পড়ে সাত দিনের পূর্ণ রুটিন: উপকরণ, প্রস্তুতি, রাত-সকালের নিয়ম ও সতর্কতা।লেখাজাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমলসকাল-সন্ধ্যা, ঘুমের আগে ও দিনের বিভিন্ন সময়ের সুন্নাহসম্মত আমল: কোনটা কখন, কতবার পড়বেন, জাদু, জিন ও বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য।লেখারুকইয়াহর আয়াতের তালিকাসাধারণ রুকইয়াহর ২০টি আয়াত, আয়াতে শিফা, আয়াতুল হারক, আর জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা ও অসুস্থতার জন্য আলাদা আয়াত: কীভাবে পড়বেন সহ।লেখা