duabd

লেখা

ওয়াসওয়াসা রোগ: মুক্তির উপায়

ওযু-নামায নিয়ে সন্দেহ, ঈমান নিয়ে অবাঞ্ছিত চিন্তা বা কুমন্ত্রণা? পাত্তা না দেওয়ার কৌশল, মাসনূন দোয়া, রুকইয়াহ ও কখন ডাক্তার দেখাবেন।

ওযু ঠিক হলো কি না, নামাযে কয় রাকাত হলো, মনে হঠাৎ আল্লাহ বা রাসূল ﷺ সম্পর্কে বাজে কোনো চিন্তা: এমন কুমন্ত্রণা প্রায় সবারই কখনো না কখনো আসে। এক-দুই দিনের এমন চিন্তায় ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর যদি এটা লেগে থাকে, ইবাদাত কষ্টকর হয়ে যায়, জীবন থমকে যায়, তাহলে পরিকল্পিতভাবে এর চিকিৎসা দরকার। এই লেখায় হাদীস ও আলিমদের পরামর্শের আলোকে সেই পথটাই ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।

ওয়াসওয়াসা কী?

ওয়াসওয়াসা মানে শয়তানের লাগাতার কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা। কোনো একটি বিষয়ে বারবার খোঁচা দিয়ে মানুষকে অস্থির করে তোলা হয়, যাতে সে ইবাদাত থেকে দূরে সরে যায়। আরবিতে একে ওয়াসওয়াস বা আল-ওয়াসওয়াস আল-কাহরী বলে। প্রকট হলে কেউ কেউ মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন, এমনকি আল্লাহ, রাসূল ﷺ, কুরআন-হাদীস বা শরীয়ত নিয়ে সংশয়ে পড়ে যান।

লক্ষ করার মতো বিষয়: যারা দ্বীনের পথে চলতে চান বা নতুন করে দ্বীনের দিকে ফিরেছেন, ওয়াসওয়াসা তাদেরই বেশি আসে। চোর খালি ঘরে ঢোকে না; যেখানে সম্পদ আছে, সেখানেই যায়। তাই কুমন্ত্রণা এলে হতাশ না হয়ে মুমিন হওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।

কয়েকজন সাহাবী রাসূল ﷺ-কে জানালেন, তাদের মনে এমন কথা আসে যা মুখে আনার চেয়ে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া তাদের কাছে প্রিয়। তিনি বললেন, এটা খাঁটি ঈমানের লক্ষণ। (মুসলিম ১৩২) অর্থাৎ চিন্তাটা মনে আসা আপনার অপরাধ নয়; সেটাকে ঘৃণা করাই আপনার ঈমানের প্রমাণ।

পরামর্শগুলো মানার পাশাপাশি ওযু, গোসল, পবিত্রতা ও নামাযের প্রয়োজনীয় মাসআলাগুলো একজন নির্ভরযোগ্য আলিমের কাছ থেকে ভালোভাবে জেনে নিন। বিধান স্পষ্ট জানা থাকলে সন্দেহ সামলানো অনেক সহজ হয়।

লক্ষণ

  • কারণে-অকারণে সবসময় চিন্তিত থাকা; মাথায় এলোমেলো চিন্তা ঘোরায় কাজ, নামায, যিকির ও তিলাওয়াতে মনোযোগ না বসা।
  • হঠাৎ আচরণ বদলে যাওয়া, উদাসীনতা, কিছুই ভালো না লাগা।
  • ওযু-গোসল, নামাযের শুদ্ধতা বা আরবি উচ্চারণ নিয়ে অতিরিক্ত দ্বিধা; বারবার মনে হওয়া, কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে না।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা পোশাক পাক কি না, তা নিয়ে অস্বাভাবিক চিন্তা।
  • ওযু-গোসল বা শৌচকর্মে একই অঙ্গ বারবার ধোয়া, তবুও তৃপ্তি না আসা; টয়লেট-গোসলখানায় অনেক বেশি সময় কাটানো।
  • বিশেষত নামাযে বারবার মনে হওয়া, ওযু ভেঙে গেছে, প্রস্রাবের ফোঁটা পড়েছে বা বায়ু বের হয়েছে, অথচ নিশ্চিত হতে না পারা।
  • বড়দের, উস্তাযের বা মুরব্বিদের সামনে মনে হওয়া, ভেতর থেকে কেউ বেয়াদবি করতে উসকে দিচ্ছে।
  • আল্লাহ, রাসূল ﷺ বা ইসলাম নিয়ে বারবার অবমাননাকর চিন্তা আসা; মনে হওয়া কেউ কানে কানে বলছে “তুমি কাফির হয়ে যাচ্ছ”।
  • মাঝে মাঝে অদ্ভুত শব্দ বা কণ্ঠ শুনতে পাওয়া।
  • নামাযে রাকাত বা সিজদার সংখ্যা নিয়ে প্রায়ই সন্দেহ; রুকু-সিজদা দীর্ঘ করতে না পারা; গুরুতর হলে সিজদায় অশ্লীল দৃশ্য বা মূর্তির ছবি মনে ভেসে ওঠা।
  • সারাক্ষণ অশ্লীল চিন্তা, যা সহজে তাড়ানো যায় না।
  • স্বপ্নে নোংরা, ময়লা বা পায়খানা দেখা; প্রিয়জনদের নিয়ে বাজে স্বপ্ন।

পুরোনো বা বেড়ে যাওয়া ওয়াসওয়াসা থেকে শারীরিক ও মানসিক জটিলতাও হতে পারে, যেমন বারবার ধোয়া-মোছার কারণে প্রস্রাবের ইনফেকশন, বা শুচিবায়ু (OCD)।

কণ্ঠ শুনতে পাওয়া, প্রবল অস্থিরতা, ঘুম-খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, দিনের বড় অংশ ধোয়া-মোছা বা যাচাইয়ে চলে যাওয়া, কিংবা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসা: এগুলো চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে (যেমন OCD, উদ্বেগ বা অন্য মানসিক রোগ)। এমন হলে অবশ্যই একজন সাইকিয়াট্রিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে যান। এটা ঈমানের দুর্বলতা নয়; ডাক্তারের চিকিৎসা আর রুকইয়াহ একসাথে চলতে পারে। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা ইনফেকশনের লক্ষণ থাকলে ডাক্তার দেখান। ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।

সংক্ষেপে মুক্তির উপায়

  1. পুরুষ হলে মসজিদে জামাআতে নামায পড়ুন; নেককারদের সঙ্গে থাকুন; যথাসম্ভব গুনাহ থেকে বাঁচুন।
  2. নাপাকি, বিশেষত প্রস্রাবের ছিটা থেকে সতর্ক থাকুন; সম্ভব হলে সবসময় ওযু অবস্থায় থাকুন।
  3. নামাযে বা ঘুমের সময় কুমন্ত্রণা এলে “আউযু বিল্লাহ” পড়ে বাম দিকে হালকা করে ৩ বার থুতু ফেলুন।
  4. প্রতি নামাযের আগে-পরে, অন্তত সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার পড়ুন: ঘুমের মধ্যে ভয় পেলে বা অস্থির লাগলে
  5. ঈমান নিয়ে কুমন্ত্রণা এলে সূরা ইখলাস পড়ুন।
  6. সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল গুরুত্ব দিয়ে করুন; টয়লেটে ঢোকার দোয়া কখনো বাদ দেবেন না।
  7. প্রতিদিন আয়াতুল হারক তিলাওয়াত করুন ও শুনুন।
  8. রুকইয়ার পানি দুই বেলা পান করুন ও গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করুন (নিচে বিস্তারিত)।
  9. আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে দোয়া করতে থাকুন, আর যতটা সম্ভব ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা দেবেন না।

একেকজনের ক্ষেত্রে একেক পন্থা বেশি কাজে দেয়। কিন্তু নিয়মিত ও যথাযথভাবে মানলে সমস্যা যত পুরোনোই হোক, পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব, ইন শা আল্লাহ।

বিস্তারিত পরামর্শ

১. গুনাহ থেকে বাঁচা ও জামাআতের সাথে থাকা

পুরোপুরি নিষ্পাপ থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু যতটুকু পারা যায় বাঁচতে হবে, আগে বড় গুনাহ থেকে। আল্লাহ বলেছেন, কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচলে তিনি ছোট দোষগুলো মাফ করবেন (আন-নিসা ৪:৩১), এবং সাধ্যমতো তাকওয়া অবলম্বন করতে বলেছেন (আত-তাগাবুন ৬৪:১৬)। গুনাহ ছাড়ার জন্যও আল্লাহর সাহায্য চান।

মুআয (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে: দল থেকে বিচ্ছিন্ন বকরিকে যেমন নেকড়ে ধরে, শয়তানও তেমনি মানুষের নেকড়ে; তাই জামাআত আঁকড়ে থাকো। (মুসনাদে আহমাদ) জামাআতে নামায আত্মিক শক্তি বাড়ায়। জামাআত মিস করিয়ে দেয় এমন কাজ থাকলে নামাযের পরে করুন।

২. মাসনূন যিকির নিয়মিত করা

পুরো তালিকা: জাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমল।

৩. পাত্তা না দেওয়া: সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ

ওয়াসওয়াসা চোরাবালির মতো: যত নড়াচড়া, তত ডুবে যাওয়া। এটা স্থায়ী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এ নিয়ে বারবার ভাবা। তাই:

  • ১০০ ভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোনো সন্দেহকে গুরুত্ব দেবেন না। মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে যান।
  • সম্ভব হলে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাবেন না। প্রতিক্রিয়া না পেলে শয়তান একসময় হাল ছেড়ে দেয়।
  • “তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে” জাতীয় প্রশ্ন মনে এলে আল্লাহর আশ্রয় চান এবং চিন্তাটা ওখানেই থামিয়ে দিন। (বুখারী ৩২৭৬, মুসলিম ১৩৪) বলুন: ঈমানে সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা এলে অথবা ঈমানে সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা এলে। এক বর্ণনায় সূরা ইখলাস পড়ার কথাও আছে।
  • ঈমান নিয়ে কুমন্ত্রণায় সূরা হাদীদের ৩ নম্বর আয়াত পড়ুন; ইবনু আব্বাস (রা.) এক ব্যক্তিকে এটি পড়তে বলেছিলেন: মনে সন্দেহ ও কুমন্ত্রণা এলে: হুওয়াল আওওয়ালু ওয়াল আখির (আবু দাউদ ৫১১০)

নিজেকে বলুন: “আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি।” আপনি জানেন আপনি মুমিন; এর বাইরে কোনো তর্কে যাওয়ার দরকার নেই।

৪. রিয়ার ভয়ে নেক আমল ছাড়বেন না

একটি সাধারণ কুমন্ত্রণা হলো, ভালো কাজ করতে গেলেই মনে হয় “এটা তো লোক দেখানো”, ফলে মানুষ আমলটাই ছেড়ে দেয়। এর জবাব হলো: আল্লাহ বলেছেন বলে আমি করছি; কেউ দেখুক বা না দেখুক, প্রশংসা করুক বা নিন্দা, আমি আমল চালিয়ে যাব। বুযুর্গরা বলেছেন, নিয়মিত আমল শুরুতে রিয়ার মতো লাগে, লেগে থাকলে অভ্যাস হয়, আরও লেগে থাকলে ইবাদাতের স্বাদ আসে।

বিজ্ঞ আলিমদের সাথে পরামর্শ করুন, তাদের মজলিসে বসুন, কোনো হক্কানী শাইখের সাথে সম্পর্ক রাখুন; সম্ভব না হলে আত্মশুদ্ধির নিয়তে তাদের বই পড়ুন বা বয়ান শুনুন।

৫. কুমন্ত্রণার বিপরীতে ভালো কাজ ঠিক করে রাখা

বিশেষ করে গুনাহের কুমন্ত্রণায় এটি শক্তিশালী কৌশল। আগে থেকেই নিয়ত করে রাখুন: নামাযে অশ্লীল চিন্তা এলে পরে ২ রাকাত নফল নামায পড়বেন, বা ১০ বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবেন। চিন্তা এলেই দ্রুত সেটা করে ফেলুন। শয়তান দেখবে, তার চেষ্টায় বান্দা আল্লাহর আরও কাছে যাচ্ছে, তখন সে নিজেই সরে যাবে।

শয়তানকে গালি বা অভিশাপ দেবেন না; এতে সে অহংকারে ফুলে ওঠে। বরং “বিসমিল্লাহ” বলুন, এতে সে মাছির মতো ছোট হয়ে যায়। (আবু দাউদ ৪৯৮২)

৬. বাম দিকে থুতু ফেলা

উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) নামাযে ও তিলাওয়াতে বিঘ্নের অভিযোগ করলে রাসূল ﷺ বললেন, এটি খিনযিব নামের শয়তান; টের পেলে আল্লাহর আশ্রয় চাও এবং বাম দিকে তিনবার থুতু ফেলো। তিনি তা করলেন, আর আল্লাহ সমস্যাটা দূর করে দিলেন। (মুসলিম ২২০৩) দোয়া: নামাযে শয়তানের কুমন্ত্রণা এলে

  1. কুমন্ত্রণা টের পেলে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম” পড়ুন।
  2. বাম দিকে ৩ বার হালকা থুতু ফেলুন। মুখ ভরে নয়, সামান্য ছিটা বের হলেই যথেষ্ট।
  3. এটা শুধু নামাযে নয়, ঘুমের সময় বা অন্য যেকোনো সময়েও করা যায়।

৭. পবিত্রতা এবং ওযু-গোসল নিয়ে ওয়াসওয়াসা

প্রস্রাবের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হাদীসে কড়াভাবে বলা হয়েছে। (মুসতাদরাকে হাকিম) আরেক হাদীসে ওযু-গোসলের জায়গায় প্রস্রাব করতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ বেশির ভাগ ওয়াসওয়াসা সেখান থেকে আসে। (আবু দাউদ ২৭, নাসাঈ) এর মানে যেখানে পানি জমে থাকে এমন গোসলের জায়গা; আজকের টয়লেট-সংযুক্ত বাথরুম ব্যবহার এই নিষেধের মধ্যে পড়ে না।

ওযু শেষে যদি সবসময় মনে হয় কোনো অঙ্গ ধোয়া হয়নি:

  1. কয়েকদিন ধীরে-সুস্থে, মনোযোগ দিয়ে ওযু করুন। প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় মনে মনে বলুন, “এই যে হাত ধুলাম… মুখ ধুলাম… পা ধুলাম।”
  2. এরপরও সন্দেহ হলে কোনো অঙ্গ কমপক্ষে ১ বার, সর্বোচ্চ ৩ বার ধোবেন। এর বেশি কখনো নয়।
  3. তিনবারের পর মন চাইলেও থেমে যান। ভাবুন: যতটুকু করেছি তা-ই যথেষ্ট, বাকিটা আল্লাহর হাতে; আল্লাহ সাধ্যের বাইরে চাপ দেন না।

সাথে এই আয়াত ও দোয়াগুলো পড়ুন, সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার এবং কুমন্ত্রণা টের পাওয়ামাত্র (নামাযের ভেতরে হলে নামায শেষে):

৮. আয়াতুল হারক, রুকইয়ার পানি, তেল ও হিজামা

আয়াতুল হারক হলো জাহান্নাম, আযাব ও শাস্তির আয়াতগুলো। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গুনাহ ও ইবাদাত-সংক্রান্ত ওয়াসওয়াসায় এগুলো বিশেষ উপকারী। প্রতিদিন নিজে তিলাওয়াত করুন (শোনার চেয়ে নিজে পড়ার প্রভাব অনেক বেশি) এবং তিলাওয়াত শুনুন। আয়াতগুলোর তালিকা: রুকইয়াহর আয়াতের তালিকা।

  1. রুকইয়ার পানি: পানির পাত্র কাছে নিয়ে সূরা আল-ফাতিহা: সর্বোত্তম দোয়া, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস, সূরা মুমিনূনের আয়াত দুটি, কিছু আয়াতুল হারক এবং উপরের দোয়াগুলো ৩ বা ৭ বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
  2. ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির নিয়তে সকাল-বিকাল এই পানি পান করুন, এবং গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করুন।
  3. তেল: অলিভ অয়েল বা অন্য তেলে একইভাবে পড়ে ফুঁ দিয়ে বুকে মালিশ করুন।
  4. হিজামা: ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির নিয়তে হিজামা করাতে পারেন। যিনি হিজামা করবেন তাকেও জানিয়ে দিন, যেন দুজনেই এই নিয়ত করেন। অভিজ্ঞ ও স্বাস্থ্যবিধি মানেন এমন কারও কাছে করাবেন।

পানি ও তেল তৈরির নিয়ম: রুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদান।

৯. জিনের সমস্যা আছে কি না যাচাই

জিনের আসর, জিন দিয়ে করা জাদু, বিশেষত জিনের নজর থাকলে ওয়াসওয়াসা অনেক বেড়ে যায়; পরিবারের কারও এমন সমস্যা থাকলে অন্যদেরও বাড়তে পারে। অন্য লক্ষণও মিললে যাচাই করে সঠিকভাবে রুকইয়াহ করুন; জিনের সমস্যা গেলে ওয়াসওয়াসাও কমে যায়। দেখুন: জিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসা। তবে সব ওয়াসওয়াসাকে জিনের কাজ ভেবে আতঙ্কিত হবেন না।

১০. তিলাওয়াতের সিজদা ও দীর্ঘ সিজদা

আলিমরা পরামর্শ দেন, প্রতিদিন সিজদার আয়াত আছে এমন একটি সূরা তিলাওয়াত করে সিজদার আয়াতে সিজদা দিন। হাদীসে আছে, আদম সন্তান সিজদার আয়াত পড়ে সিজদা করলে শয়তান কাঁদতে কাঁদতে সরে যায়। (মুসলিম ৮১) ছোট-মাঝারি এমন সূরা: আস-সাজদা, সোয়াদ, হা-মীম আস-সাজদা, আন-নাজম, আল-ইনশিকাক ও আল-আলাক। নামাযের সিজদা দীর্ঘ করাও উপকারী।

১১. আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ও দোয়া

সব চেষ্টার পরও চিন্তার উৎপাত পুরো না থামলে সবর করুন। এই চিন্তা আপনার ঈমানের ক্ষতি করবে না, বরং সবরের সওয়াব ও মর্যাদা বাড়াবে। মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণকর: সুখে শোকর, দুঃখে সবর। (মুসলিম ২৯৯৯) “আমার সাথেই কেন” ভেবে অন্যদের সাথে তুলনা করবেন না।

নিজের সমস্যা নিয়ে সবার সাথে আলোচনা না করে নামায শেষে হাত তুলে আল্লাহর কাছে বলুন। শয়তানের খোঁচা টের পেলে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়াই কুরআনের নির্দেশ: শয়তানের খোঁচা এলে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৬) (ফুসসিলাত ৪১:৩৬) অন্য মুসলিমদের জন্যও দোয়া করুন; কেউ অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করলে ফেরেশতা তার জন্যও একই দোয়া করেন। (মুসলিম ২৭৩২)

সতর্কতা

  • ওযু-গোসলে কোনো অঙ্গ তিনবারের বেশি ধোবেন না, মন যত চাপই দিক।
  • নিজের সন্দেহগুলো নিয়ে বারবার মানুষকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চাওয়াও এক ধরনের পাত্তা দেওয়া; একবার আলিমের কাছ থেকে মাসআলা জেনে নিয়ে তার ওপর আমল করুন।
  • ওয়াসওয়াসার জন্য কবিরাজ, তাবিজ বা “বাটি চালান” ধরনের কিছুর কাছে যাবেন না; এগুলো সমস্যা বাড়ায় এবং ঈমানের জন্য বিপজ্জনক।
  • শুধু রুকইয়াহ বা শুধু ওষুধ নয়: প্রয়োজনে দুটোই।

সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ২১২–২২৫), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।

আরও পড়ুন

রুকইয়াহ কী?রুকইয়াহ শারইয়্যাহর অর্থ, জায়িয হওয়ার তিন শর্ত, রুকইয়ার তিন স্তর, জরুরি পরিভাষা এবং কেন প্রত্যেক পরিবারে কারো না কারো রুকইয়াহ জানা দরকার।লেখাসুন্নাহসম্মত রুকইয়াহর ১০টি পদ্ধতিশুধু তিলাওয়াত, হাত রেখে পড়া, ফুঁ, হালকা থুতু, হাত বুলানো, পানি-লবণ, মাটি ও টানা কয়েক দিন: হাদীসে আসা রুকইয়ার দশটি পদ্ধতি ও প্রয়োগের নিয়ম।লেখারুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদানরুকইয়ার আগে ঘর ও মন প্রস্তুত করা, রুকইয়ার পানি, যমযম, মধু, কালোজিরা, বরই পাতা, রুকইয়ার গোসলের নিয়ম এবং রুকইয়ার অডিও নিয়ে জরুরি প্রশ্নোত্তর।লেখানিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?সত্তর হাজারের হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা, কখন নিজে আর কখন অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ করাবেন, ভালো রাক্বীর বৈশিষ্ট্য এবং জাদুকর কবিরাজ চেনার লক্ষণ।লেখারুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝারুকইয়ার পর ক্লান্তি, ব্যথা বা বমি হলে কী করবেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন, সুস্থ হতে কেন দেরি হয় এবং কীভাবে বুঝবেন রুকইয়াহ সত্যিই শেষ।লেখাবদনজর: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসাবদনজর সত্য, তবে এর চিকিৎসা সহজ। লক্ষণ, প্রতিদিনের সুরক্ষা আর ওযুর পানি, দোয়া ও রুকইয়ার গোসলসহ চারটি পদ্ধতি ধাপে ধাপে।লেখাজিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসাজিনের আসর কেন ও কখন হয়, কীভাবে চিনবেন ও বাঁচবেন, আর কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতিতে কীভাবে রুকইয়াহ করবেন: শান্ত ও বিস্তারিত নির্দেশনা।লেখাবাড়িতে জিনের সমস্যা হলেবাড়িতে অস্বাভাবিক আওয়াজ, ছায়া বা জিনিস সরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে কী করবেন: কারণ, পাঁচটি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি ও পরে যা মেনে চলবেন।লেখাজাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহজাদুর বাস্তবতা, ধরন ও লক্ষণ, জাদুকর কবিরাজ চেনার উপায়, তাবিজ ও জাদুর জিনিস নষ্টের নিয়ম এবং জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ ও প্রেসক্রিপশন।লেখাবিভিন্ন ধরনের জাদুর রুকইয়াহবিয়ে আটকানো, বিচ্ছেদ, বশ করা, পাগল বানানো, বান মারা, ইস্তিহাযা, সহবাসে অক্ষমতা ও গর্ভপাতের জাদু: প্রতিটির লক্ষণ ও দিনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন।লেখাসাধারণ অসুস্থতায় রুকইয়াহব্যথা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা, চোখ, তোতলামি, শ্বাসকষ্ট, হাড়ক্ষয় ও ক্লান্তিতে ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত রুকইয়ার নিয়ম।লেখাশিশুদের রুকইয়াহশিশুর রুকইয়াহ সহজ: কোলে নিয়ে মাথায় হাত রেখে মাসনূন দোয়া ও তিন কুল। তাবিজ-টিপ ছাড়া সুরক্ষা, কখন বদনজর, আর যা কখনো করবেন না।লেখাআল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্সপানি, অলিভ অয়েল, মধু ও কালোজিরায় রুকইয়াহ পড়ে সাত দিনের পূর্ণ রুটিন: উপকরণ, প্রস্তুতি, রাত-সকালের নিয়ম ও সতর্কতা।লেখাসার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রামসমস্যা কয়েক রকম, বুঝতে পারছেন না কোন রুকইয়াহ লাগবে? প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ ও প্রতি মাসের একটি সাধারণ রুকইয়াহ রুটিন।লেখাজাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমলসকাল-সন্ধ্যা, ঘুমের আগে ও দিনের বিভিন্ন সময়ের সুন্নাহসম্মত আমল: কোনটা কখন, কতবার পড়বেন, জাদু, জিন ও বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য।লেখারুকইয়াহর আয়াতের তালিকাসাধারণ রুকইয়াহর ২০টি আয়াত, আয়াতে শিফা, আয়াতুল হারক, আর জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা ও অসুস্থতার জন্য আলাদা আয়াত: কীভাবে পড়বেন সহ।লেখা