শিশু হঠাৎ খাওয়া ছেড়ে দিল, রাতে অকারণে কাঁদছে, বেড়িয়ে আসার পর থেকে অস্থির: এমন অবস্থায় অনেক বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, আর কেউ কেউ ছুটে যান কবিরাজের কাছে। অথচ শিশুদের রুকইয়াহ খুবই সহজ, বাবা-মা নিজেরাই করতে পারেন। শিশুদের গুনাহ থাকে না বলে অল্প রুকইয়াতেই সাধারণত বেশি উপকার পাওয়া যায়, ইন শা আল্লাহ।
শুরুর আগে তিনটি কাজ
- তাবিজ-কবচ ও নজর-টিপ সরিয়ে ফেলুন। শিশুর গায়ে তাবিজ, কবচ, কালো সুতা বা নজর ঠেকানোর টিপ থাকলে তা খুলে নষ্ট করে ফেলুন। কোনো সমস্যা না থাকলেও এসব জিনিস নিজেই সমস্যা তৈরি করে, আর ভরসাকে আল্লাহ থেকে সরিয়ে বস্তুর দিকে নিয়ে যায়। তাবিজ নষ্ট করার নিয়ম: জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ।
- ঘরকে রহমতের ফেরেশতাদের উপযোগী রাখুন। প্রাণীর ছবি, প্রাণীর আকৃতির পুতুল, বাদ্যযন্ত্র বা এমন কিছু ঘরে রাখবেন না, যা রহমতের ফেরেশতা প্রবেশে বাধা দেয়।
- ঘাবড়াবেন না। শিশুদের সরাসরি জিন বা জাদুর সমস্যা খুব কম হয়। তাই একটু অস্বাভাবিক আচরণ দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে বদনজর লাগতে পারে, তাই বদনজরের রুকইয়াহ করা যায়।
যেহেতু একই উপসর্গের অনেক কারণ থাকতে পারে, তাই নির্দিষ্ট করে “বদনজরের জন্য” নিয়ত না করে যে সমস্যাটা দেখা যাচ্ছে, সেটার আরোগ্যের নিয়তে রুকইয়াহ করাই ভালো। কারণ নিশ্চিতভাবে বোঝা গেলে অবশ্য ভিন্ন কথা।
শিশুর জ্বর, বমি, পাতলা পায়খানা, খাওয়া বন্ধ, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, নেতিয়ে পড়া বা পানিশূন্যতার লক্ষণ থাকলে আগে শিশু-বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যান। শিশুদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। রুকইয়াহ চিকিৎসার পাশাপাশি চলবে, কখনো তার বদলে নয়।
রুকইয়াহ করার নিয়ম
- শিশুকে কাছে ডেকে স্বাভাবিকভাবে বসান, অথবা কোলে নিন।
- পুরো মনোযোগ শিশুর দিকে দিন; মোবাইল বা অন্য কাজ সরিয়ে রাখুন।
- শিশুর মাথায় হাত রেখে রুকইয়ার দোয়া ও আয়াতগুলো কয়েকবার পড়ুন।
- পড়ার মাঝে মাঝে শিশুর গায়ে আলতো করে ফুঁ দিন।
ব্যস, এটুকুই। কী পড়বেন:
- হাদীসে বর্ণিত এই দোয়া: সন্তানদের হেফাযতের দোয়া রাসূল ﷺ হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এমন দোয়া পড়তেন। (বুখারী ৩৩৭১) দুই সন্তানের জন্য পড়ার রূপ: সন্তানদের হেফাযতের দোয়া।
- সূরা আল-ফাতিহা: সর্বোত্তম দোয়া
- সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস: তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস
- চাইলে বদনজরের রুকইয়ার অন্য মাসনূন দোয়াগুলোও: জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি আরকীক, জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি ইউবরীক, আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ।
প্রয়োজনে পরপর কয়েকদিন সকাল-বিকাল এভাবে রুকইয়াহ করুন। পানি বা খাবারে পড়ে ফুঁ দিয়ে খাওয়াতে পারেন, আর রুকইয়ার পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিতে পারেন। পানি ও গোসলের নিয়ম: রুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদান।
বদনজরের দিকে ইঙ্গিত করে যেসব অবস্থা
কোথাও বেড়াতে গিয়ে সবাই শিশুকে খুব আদর-প্রশংসা করল, কিংবা তার ছবি-ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া হলো, আর তারপর থেকেই খাবারে অরুচি, রাতে অস্থিরতা, অকারণ কান্না, বমি বা পেটের গোলমাল শুরু হলো: এমন ক্ষেত্রে বদনজরের সম্ভাবনা থাকে। আগে সুন্দর কথা বলা শিশুর হঠাৎ তোতলামি শুরু হওয়াও বদনজরের কারণে হতে পারে। শিশুর অকারণ ভয় ও অস্বাভাবিক কান্না জিনের নজরের (যাকে অনেকে “বাতাস লাগা” বলে) ইঙ্গিতও হতে পারে। বিস্তারিত লক্ষণ: বদনজর: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা।
এমন হলে উপরের নিয়মে রুকইয়াহ করুন। কার নজর লেগেছে জানা থাকলে তাকে ওযু করিয়ে সেই পানি শিশুর গায়ে ঢেলে দেওয়ার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিও আছে। (মুয়াত্তা মালিক; ইবনু মাজাহ ৩৫০৯) এক ঘটনায় শিশুর বাবা-মা নিজেরা ওযু করে সেই পানি ঢেলে দেওয়ার পর শিশু কিছুক্ষণের মধ্যে সুস্থ হয়েছিল, কারণ নিজের সন্তানের ওপর মা-বাবার নজরও লাগতে পারে। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া ছবি-ভিডিও সরিয়ে ফেলুন।
রুকইয়ার সময় কী দেখা যেতে পারে
বদনজর থাকলে রুকইয়ার সময় বা পরে শিশুর খুব ঘুম পেতে পারে, বারবার হাই উঠতে পারে, শরীর ঘামতে বা চুলকাতে পারে, কিংবা পরে পায়খানা-প্রস্রাবের বেগ আসতে পারে। এগুলো সাধারণত ক্ষণস্থায়ী, তাই ভয় পাবেন না। আবার কোনো প্রতিক্রিয়া না হলেও রুকইয়াহ কাজ করছে না, এমন নয়। শিশু সুস্থ হয়ে গেলে লক্ষণগুলো চলে যায়, তখন আর রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; শুধু প্রতিদিনের সুরক্ষার আমলগুলো চালু রাখুন। আরও জানতে: রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা।
জটিল সমস্যা হলে
জাদু বা জিনের আসরের লক্ষণ যদি স্পষ্টভাবে দেখা দেয়, তাহলে বড়দের মতো একটু দীর্ঘ সময় রুকইয়াহ এবং রুকইয়ার পানি, তেল, মধুর মতো সাপ্লিমেন্ট লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশুর বয়স, শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝে পরিমাণ কমিয়ে-বাড়িয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্স-ও করানো যায়। অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিতে চাইলে দেখুন: নিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?
প্রতিদিনের সুরক্ষা
- সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার সন্তানদের হেফাযতের দোয়া পড়ে শিশুদের গায়ে ফুঁ দিন, নিজের জন্যও পড়ুন। এর জন্য কোনো তাবিজ বা নজর-টিপের দরকার নেই।
- মাঝে মাঝে সূরা ফালাক ও নাস পড়ে শিশুর গায়ে ফুঁ দিন।
- শিশু নিজে সকাল-সন্ধ্যার আমল করতে না পারলে বড় কেউ পড়ে তাকে ফুঁ দিয়ে দিন। পুরো তালিকা: হেফাযতের মাসনূন আমল।
- কেউ শিশুর প্রশংসা করলে “মা শা আল্লাহ” বা বরকতের দোয়া বলুন: পছন্দের কিছু দেখলে (বদনজর থেকে বাঁচাতে)।
- শিশুর ছবি, ভিডিও বা সাফল্যের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানো থেকে বিরত থাকুন।
- দোয়া পড়ার পর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
যে বিষয়গুলো কখনো ভুলবেন না
- রুকইয়ার সময় শিশুকে কখনো মারধর করবেন না।
- এক জায়গায় বা এক ভঙ্গিতে বসে থাকতে জোর করবেন না। এমন কিছু করবেন না, যাতে সে ভয় পায়।
- জিন-শয়তানের ভয় দেখাবেন না, বরং সাহস দিন। গল্পে গল্পে বোঝান যে আল্লাহর কালাম সবচেয়ে শক্তিশালী, আর শয়তান দুর্বল।
- একদম ছোটবেলা থেকেই ছোট ছোট যিকির-আযকার মুখস্থ করান এবং পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- পরিবারের সবাই পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে গুরুত্ব দিন।
- ছোট থেকেই মসজিদে গিয়ে জামাআতে নামায পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
শিশুর রুকইয়াহ সাধারণত বাবা-মা বা পরিবারের মাহরাম কেউ করবেন। বাইরের কেউ রুকইয়াহ করলে বাবা-মায়ের উপস্থিতিতে করবেন; কোনো রাক্বী শিশুকে ভয় দেখালে, মারধর করলে বা তাবিজ দিতে চাইলে সেখান থেকে সরে আসুন।
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ২৩৬–২৩৭; সাথে বদনজর অধ্যায়, পৃ. ৭৭–৮৯), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।