রুকইয়ার প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে তিলাওয়াতের একাগ্রতার ওপর। তাই শুরুর আগে পরিবেশ ঠিক করা, প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে রাখা আর মন আল্লাহর দিকে ফেরানো জরুরি। এই লেখায় আছে রুকইয়ার প্রস্তুতি, রুকইয়ার পানি ও অন্যান্য সহায়ক উপাদান, রুকইয়ার গোসলের কয়েকটি পরীক্ষিত নিয়ম, এবং রুকইয়ার অডিও শোনা নিয়ে প্রশ্নোত্তর।
রুকইয়ার আগে: ১০টি প্রস্তুতি
নিজের জন্য সেলফ রুকইয়াহ হোক বা রাক্বী হিসেবে অন্যের জন্য, শুরুর আগে এগুলো খেয়াল রাখুন:
- ঘর পরিষ্কার করুন: ঘরে টাঙানো বা সাজানো প্রাণীর ছবি, মূর্তি-ভাস্কর্য ও পুতুল সরিয়ে ফেলুন, যাতে রহমতের ফেরেশতা আসেন।
- উপস্থিত সবাই শরীয়তসম্মত অবস্থায় থাকবেন: পুরুষের গায়ে রেশম বা সোনা থাকবে না, নারীরা পর্দায় থাকবেন। ঘরে বাদ্যযন্ত্র বা কুকুর রাখা যাবে না।
- তাবিজ খুলে নষ্ট করুন: রোগীর সাথে বা ঘরে কোনো তাবিজ-কবচ থাকলে খুলে নষ্ট করুন। নিয়ম জানতে দেখুন জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ।
- নারী রোগী পূর্ণ পর্দায় থাকবেন: তার মাহরাম পুরুষ রুকইয়াহ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। জিনের চিকিৎসার জন্যও রোগীর চেহারা দেখার প্রয়োজন নেই।
- মাহরামের উপস্থিতি: রাক্বী মাহরাম না হলে রোগীর বাবা, ভাই বা স্বামীর মতো কোনো মাহরাম অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন। একান্ত সম্ভব না হলে অন্তত বয়স্ক কোনো নারী আত্মীয় থাকবেন। রাক্বী কোনো অবস্থায় গাইর মাহরামকে স্পর্শ করবেন না।
- ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিয়ে দিন: রোগী ও পরিবারকে সংক্ষেপে জানান, সুস্থ করার ক্ষমতা কোনো চিকিৎসকের নয়, শুধু আল্লাহর। আল্লাহ কুরআনে শিফা রেখেছেন, কতদিন লাগবে তা তিনিই জানেন, আমরা শুধু চেষ্টা করব। সাথে শিরকি ঝাড়ফুঁক সম্পর্কে সতর্ক করুন।
- লক্ষণ জেনে নিন: যে সমস্যা মনে হচ্ছে তার লক্ষণগুলো ভালোভাবে জিজ্ঞেস করুন, অন্য সমস্যার কিছু সাধারণ লক্ষণও জেনে নিন (নিচে দেখুন)।
- নিরাপত্তা: জিনের রোগীর ঠিক সামনে বা খুব কাছে কেউ বসবেন না, তার হাতের কাছে আঘাত করার মতো কিছু রাখবেন না। জাদুর রোগীর পাশে একটি বালতি বা পাত্র রাখুন, বমি হলে কাজে লাগবে।
- ওযু করুন: রোগী ও রাক্বী দুজনেই ওযু করে নিন। রাক্বী মিসওয়াক করলে ভালো। দোয়া কবুলের সময়গুলোতে রুকইয়াহ করা উত্তম, তবে জরুরি নয়।
- ইস্তিগফার ও দরুদ দিয়ে শুরু করুন: উপস্থিত সবাই ইস্তিগফার ও দরূদে ইবরাহীম পড়ে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে রুকইয়াহ শুরু করুন।
কোনো সাপ্লিমেন্ট (যেমন পানি, তেল) লাগলে আগেই তৈরি রাখুন, যাতে মাঝপথে উঠে মনোযোগ নষ্ট না হয়।
তাবিজ রেখে রুকইয়াহ নয়। তাবিজ আল্লাহর ওপর ভরসার পথে বাধা। সাথে কুফরি তাবিজ থাকলে শরঈ রুকইয়াহ প্রায়ই কাজ করে না, উল্টো সমস্যা বেড়ে যায়। কবিরাজের দেওয়া কোনো জিনিস রেখে দেবেন না।
রাক্বী লক্ষণ কীভাবে জিজ্ঞেস করবেন
অনেক রোগীর হালাল উপার্জন, পর্দা, ফরয গোসল বা পাক-নাপাকের মতো মৌলিক বিধান সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা থাকে না। প্রয়োজনে কোমলভাবে তার দ্বীনদারির খোঁজ নিন। তারপর:
- বদনজর মনে হলে: নজরের লক্ষণগুলো জিজ্ঞেস করুন, সাথে জিন ও জাদুর কিছু সাধারণ প্রশ্ন: রাতে ঘুম হয় কি না, পিঠ, মাথা বা পেটে ব্যথা থাকে কি না, প্রায়ই মেজাজ খারাপ থাকে কি না।
- নির্দিষ্ট জাদু মনে হলে: সে বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করুন, আর জিন ও নজর নিয়ে অল্প কিছু প্রশ্ন: একের পর এক অসুখ বা আর্থিক ঝামেলা, অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক বা চুল পড়া, ঘন ঘন বোবায় ধরা, কেমন স্বপ্ন দেখেন, পুরোনো কোনো ব্যথা আছে কি না।
অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে সময় নষ্ট করবেন না। মোটামুটি ধারণা পেলে রুকইয়াহ শুরু করুন, অথবা রোগীকে নিজে সেলফ রুকইয়াহ করার পরামর্শ দিন। মনে রাখবেন, অনেক উপসর্গের পেছনে শারীরিক বা মানসিক রোগও থাকতে পারে; তাই রোগীকে ডাক্তার দেখাতেও বলুন।
সহায়ক উপাদান: আগে যা জানা জরুরি
নিচের জিনিসগুলো নিজে রুকইয়াহ নয়; এগুলো রুকইয়ার সহায়ক বা কার্যকারিতা বাড়ানোর উপাদান। ব্যবহার করা বাধ্যতামূলকও নয়। সহজে পাওয়া গেলে এবং ব্যবহারের নিয়ম ভালোভাবে জানা থাকলে কাজে লাগাতে পারেন।
১. রুকইয়ার পানি
যে পানির ওপর রুকইয়ার আয়াত ও দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া হয়, সেটাই রুকইয়ার পানি। কোন পানি নেবেন:
- যমযম সবচেয়ে উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পৃথিবীর সেরা পানি যমযম; এতে ক্ষুধার্তের খাবার ও অসুস্থের শিফা আছে। (তাবারানী, আল-মু‘জামুল আওসাত) আর যে নিয়তে যমযম পান করা হয়, তা সেই কাজেই লাগে। (ইবনু মাজাহ ৩০৬২) দেখুন যমযম পানি পানের প্রচলিত দোয়া।
- এরপর বৃষ্টির পানি। কুরআনে একে বরকতময় বলা হয়েছে (ক্বাফ ৫০:৯), আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বৃষ্টির পানি গায়ে লাগাতে কাপড় সরিয়ে দিয়েছিলেন। (মুসলিম ৮৯৮)
- এ দুটো না পেলে সাধারণ পানিই যথেষ্ট। চাইলে বরকতের জন্য তাতে কিছুটা যমযম বা বৃষ্টির পানি মিশিয়ে নিন।
রুকইয়ার পানি সাধারণত পান করা ও গোসলে ব্যবহার হয়। রুকইয়ার সময় রোগীর গায়ে ছিটানোও হয়। আর তাবিজ বা জাদুর জিনিস পাওয়া গেলে এই পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করা হয়।
তৈরির নিয়ম: পানির পাত্র মুখের কাছে রেখে রুকইয়ার আয়াত পড়ুন এবং পড়ার মাঝে মাঝে ও শেষে পানিতে ফুঁ দিন। সাধারণভাবে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী ও তিন কুল পড়তে পারেন; নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য সেই সমস্যার আয়াত যোগ করুন, যেমন জাদুর জন্য নিচের “জাদুর সাধারণ রুকইয়ার পানি”। একবারে বোতলভর্তি পানিতে না পড়ে প্রতিবার পান বা গোসলের আগে আলাদা করে পড়ে ফুঁ দিলে আরও ভালো। আরও জানতে দেখুন রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডির লেখা।
২. হিজামা (কাপিং)
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে হিজামা করিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমাদের চিকিৎসার উপকরণের মধ্যে হিজামা ও সামুদ্রিক কুস্ত উত্তম। (বুখারী ৫৬৯৬) মি‘রাজের রাতে ফেরেশতারাও তাঁকে হিজামার পরামর্শ দিয়েছিলেন। (ইবনু মাজাহ) জাদু বা বদনজরজনিত অসুস্থতায় রুকইয়ার সাথে হিজামা খুব কার্যকর; অনেকে হিজামার পর পুরোপুরি সুস্থ হন। হিজামা করাবেন প্রশিক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন কারো কাছে, আর রক্তস্বল্পতা, রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা অন্য জটিলতা থাকলে আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
৩. মধু
কুরআনে মধুতে মানুষের জন্য শিফা আছে বলা হয়েছে (আন-নাহল ১৬:৬৯)। পেটের অসুখের এক রোগীকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বারবার মধু খাওয়াতে বলেছিলেন; প্রথমে সমস্যা না কমলেও শেষে সুস্থ হয়। (বুখারী ৫৬৮৪, মুসলিম ২২১৭) এ থেকে শিক্ষা: শুরুতে সমস্যা বাড়লেও সঠিক চিকিৎসা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। রুকইয়ার পানিতে মধু গুলে পান করুন, অথবা কালোজিরার সাথে খান।
৪. কালোজিরা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কালোজিরায় মৃত্যু ছাড়া সব রোগের শিফা আছে। (বুখারী ৫৬৮৮, মুসলিম ২২১৫) মধুর সাথে খেতে পারেন, চিবিয়ে বা গুঁড়া করে খেতে পারেন, আর কালোজিরার তেল মাথা ও শরীরে মালিশ করতে পারেন।
৫. যাইতুনের তেল (অলিভ অয়েল)
বরকতময় গাছের তেল; রাসূলুল্লাহ ﷺ এটা খেতে ও শরীরে মাখতে বলেছেন। (তিরমিযী ১৮৫২) রুকইয়াহ পড়ে মাথা ও শরীরে মালিশ করা হয়। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ভালো।
৬. খেজুর (আজওয়া)
যে সকালে ৭টি আজওয়া খেজুর খায়, সেদিন বিষ ও জাদু তার ক্ষতি করতে পারে না। (বুখারী ৫৪৪৫, মুসলিম ২০৪৭) জাদুর রুকইয়ার পর আজওয়া খাওয়া উপকারী; অনেক রাক্বী রুকইয়ার আগেও খাওয়ান। মান অনুযায়ী ক্রম: মদীনার উঁচু অঞ্চলের (আলিয়া) আজওয়া (মুসলিম ২০৪৮), মদীনার অন্য আজওয়া, অন্য এলাকার আজওয়া, মদীনার অন্য খেজুর, তারপর যেকোনো ভালো খেজুর।
৭. বরই পাতা ও কর্পূর
হায়েযের গোসলে (মুসলিম ৩৩২) এবং মৃতের গোসলে (বুখারী ১২৫৩, মুসলিম ৯৩৯) বরই পাতার পানি ব্যবহারের কথা হাদীসে আছে। জাদুর চিকিৎসায় রুকইয়ার গোসলে বরই পাতা বহুল ব্যবহৃত।
- ৭টি বরই পাতা বেটে পানিতে মেশান।
- আয়াতুল কুরসী একবার, আর সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস ৩ বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে থাকুন।
- এই পানি থেকে কিছুটা পান করুন, বাকিটা দিয়ে গোসল করুন।
- কিছুদিন এভাবে করুন।
৮. সোনাপাতা (সেন্না) ও রেচক
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোনো কিছু যদি মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারত, তবে তা সোনাপাতা। (তিরমিযী ২০৮১) এটি রেচক; খেলে সাধারণত ১–২ দিন পাতলা পায়খানা হয়, আর পেটে খাওয়ানো জাদুর কিছু থাকলে বেরিয়ে যায়। জাদুর চিকিৎসায় রেচক নিলে আগে আল-আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, ইউনুস ১০:৮১–৮২, ত্বহা ২০:৬৯ এবং সূরা ফালাক ও নাস পড়ে ওষুধে ফুঁ দিন, তারপর নিয়মমতো খান, আর প্রভাব থাকা পর্যন্ত বেশি করে পানি পান করুন।
রেচক নিয়ে সাবধান। আগে থেকে ধারণা না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো রেচক নেবেন না, মাত্রাও বাড়াবেন না। কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ বা গর্ভাবস্থা থাকলে অবশ্যই আগে একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্ক থাকুন।
৯. কুস্ত (ভারতীয় ও সামুদ্রিক)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ভারতীয় কুস্তের কথা বলেছেন, এতে সাত ধরনের শিফা আছে; গলার ব্যথায় নাকে দেওয়া হয় এবং পাঁজরের ব্যথায় (নিউমোনিয়া জাতীয় রোগে) সেবন করা হয়। (বুখারী ৫৬৯২) গরম পানি বা দুধে গুলে খাওয়া যায়। জিনের রোগীর রুকইয়ায় অলিভ অয়েলের সাথে কুস্তের গুঁড়া মিশিয়ে, তার ওপর রুকইয়ার আয়াত ও আয়াতুল হারক পড়ে নাকে ড্রপ দেওয়া হয়; এটা অভিজ্ঞ কারো তত্ত্বাবধানে করা ভালো।
১০. সদকা ও দোয়া
“সদকা দিয়ে রোগের চিকিৎসা করো” মর্মে হাদীস বর্ণিত আছে। (তাবারানী, বাইহাকী) রুকইয়াহ চলার সময় আরোগ্যের নিয়তে কিছু দান করুন। আর প্রতিটি সমস্যার কথা আলাদা করে উল্লেখ করে বেশি বেশি দোয়া করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন জাদুগ্রস্ত হয়েছিলেন, কয়েকদিন অনেক দোয়া করার পর সূরা ফালাক ও নাস নাযিল হয় এবং জাদুর বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হয়।
১১. তাহাজ্জুদ
রাতের নামায নেককারদের রীতি, আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম, গুনাহ মোচন করে এবং শরীর থেকে রোগ দূর করে। (তিরমিযী ৩৫৪৯) রাতে দোয়া কবুলের একটি সময় আছে (মুসলিম ৭৫৭), আর রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ বান্দাদের ডাকেন (বুখারী ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮)। রুকইয়ার শুরুতে ও চলাকালীন প্রতি রাতে কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে আরোগ্য চান। কোনো কারণে নিজে রুকইয়াহ করতে না পারলে বা অন্য কাউকে দিয়ে করানোর সুযোগ না থাকলে তাহাজ্জুদের দোয়ায় আরও বেশি জোর দিন।
১২. তাওবা ও ইস্তিগফার
বেশি ইস্তিগফারে রিযিক, সন্তান ও স্বস্তি আসে (নূহ ৭১:১০–১২)। রাসূলুল্লাহ ﷺ দিনে ৭০ বারের বেশি ইস্তিগফার করতেন। (বুখারী ৬৩০৭) হাদীসে আছে, যে নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তাকে সংকট থেকে বের হওয়ার পথ, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি এবং অপ্রত্যাশিত রিযিক দেন। (আবু দাউদ ১৫১৮) আগের গুনাহের জন্য খাঁটি তাওবা করুন, আর অপেক্ষা, যানজট বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়েও মনোযোগ দিয়ে “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়ুন। দেখুন সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার।
অন্যান্য উপাদান
রুকইয়ার সাথে আরও কিছু জিনিস ব্যবহার হয়, যেমন ট্রাফল (এক ধরনের ছত্রাক), হিং, রেউচিনি, আপেল সিডার ভিনেগার, জিরাপানি, যষ্টিমধু, আতর, গোলাপজল ও জাফরান। ভালোভাবে না জেনে এগুলো ব্যবহারের দরকার নেই। সরাসরি রুকইয়াহ, রুকইয়ার পানি পান আর রুকইয়ার গোসল, এটুকুই যথেষ্ট।
রুকইয়ার গোসল
রুকইয়ার গোসল খুব উপকারী একটি অনুষঙ্গ। রুকইয়ার পর গোসল করলে সাধারণত অনেকটা স্বস্তি আসে। জিনের রোগীকে প্রতিদিন রুকইয়ার পর গোসল করালে রোগী দ্রুত শান্ত হয়, আর জাদু ও বদনজরের চিকিৎসায় এর গুরুত্ব আরও বেশি।
হাদীসে যা আছে: বদনজর সত্য; তাকদীরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু থাকলে তা হতো বদনজর, আর বদনজরের জন্য তোমাদের গোসল করতে বলা হলে গোসল করো। (মুসলিম ২১৮৮) যার নজর লাগত তাকে ওযু করানো হতো, আর সেই পানি দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে গোসল করানো হতো। (আবু দাউদ ৩৮৮০) সাবিত ইবনু কাইস (রা.)-এর জন্য দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে তাঁর গায়ে ঢালার ঘটনাও আগে বলা হয়েছে। (আবু দাউদ ৩৮৮৫)
একটি মূলনীতি: নিচের গোসলগুলোর হুবহু নিয়ম হাদীস থেকে আসেনি; হাদীসের মূলনীতি থেকে আলিমরা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সাজিয়েছেন। তাই যা সরাসরি হাদীসে নির্দিষ্ট সংখ্যায় এসেছে তা হুবহু সেভাবেই করতে হবে, কিন্তু ইজতিহাদ থেকে আসা সংখ্যা (১, ৩, ৭) অভিজ্ঞ কারো পরামর্শে কমবেশি করা যায়। সময় কম থাকলে ৭ বারের জায়গায় ৩ বার, দরুদ ১ বার পড়তে পারেন, চাইলে সূরা কাফিরূন বাদ দিতে পারেন; আবার চাইলে আরও আয়াত-দোয়া যোগ করতে পারেন। বেশি পড়লে উপকারও বেশি।
পদ্ধতি ১: বরই পাতার গোসল (ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রহ.)
- ৭টি বরই পাতা পিষে পানিতে দিন এবং নাড়তে থাকুন।
- আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক ও নাস পড়ে পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
- এই পানি থেকে ৩ ঢোক পান করুন, বাকিটা দিয়ে গোসল করুন।
- পানি গরম করবেন না, অন্য পানিও মেশাবেন না।
আশা করা যায় প্রথম গোসলেই জাদুর প্রভাব কাটতে শুরু করবে; কয়েকদিন এভাবে করলে ইন শা আল্লাহ রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে।
পদ্ধতি ২: বরই পাতার গোসল (শাইখ ইবনু বায রহ.)
বরই পাতা মেশানো পানিতে নিচের আয়াত ও দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দিন, তারপর কিছুটা পান করে বাকিটা দিয়ে গোসল করুন। প্রয়োজনে একাধিকবার করুন।
- সূরা ফাতিহা
- আয়াতুল কুরসী
- আল-আ‘রাফ ৭:১০৬–১২২
- ইউনুস ১০:৭৯–৮২
- ত্বহা ২০:৬৫–৬৯
- সূরা কাফিরূন
- সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস, প্রতিটি ৩ বার
- আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ, ৩ বার
- জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি আরকীক, ৩ বার
শাইখের একটি সহজ নিয়মও আছে: পাত্রে পানি নিয়ে ওপরের আয়াত ও দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া, তারপর রোগী তা পান করবেন আর বাকিটা দিয়ে গোসল করবেন।
পদ্ধতি ৩: বদনজরের গোসল
- একটি বালতিতে পানি নিয়ে দুই হাত পানিতে ডুবিয়ে রাখুন।
- যেকোনো দরুদ, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা কাফিরূন, ইখলাস, ফালাক, নাস এবং শেষে আবার দরুদ, প্রতিটি ৭ বার করে পড়ুন।
- এই পানি দিয়ে গোসল করুন।
হাত ডুবিয়ে বসে থাকার সুযোগ না থাকলে পড়া শেষে পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করলেই চলবে। এই গোসল জাদু ও জিনের রোগীর জন্যও উপকারী।
পদ্ধতি ৪: বাথ সল্টের গোসল
- ছোট একটি পাত্রে গরম পানি নিয়ে এক টেবিল চামচ বাথ সল্ট গুলে নিন; সম্ভব হলে ৭টি বরই পাতা পিষে দিন।
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, ইখলাস, ফালাক ও নাস ৩ বার করে পড়ে ফুঁ দিন। চাইলে আরও আয়াত বা দোয়া পড়ুন।
- পানিটুকু গোসলের হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে গোসল করুন।
জাদুর সাধারণ রুকইয়ার পানি
- একটি বোতলে পানি নিন।
- আল-আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, ইউনুস ১০:৮১–৮২, ত্বহা ২০:৬৯, সূরা ফালাক ও নাস, প্রতিটি ৩ বার পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
- এই পানি দিনে দুই বেলা পান করুন এবং প্রতিদিন গোসলের পানিতে কিছুটা মিশিয়ে গোসল করুন।
গোসলের পানি স্বাভাবিক ঠান্ডা হওয়াই উত্তম; একান্ত প্রয়োজনে গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন। বরই পাতার পানি খেতে না পারলে আলাদা গ্লাসে পরিষ্কার পানি নিয়ে তাতে পড়ে ফুঁ দিয়ে পান করুন।
রুকইয়ার অডিও: প্রশ্নোত্তর
শুধু অডিও শুনলেই কি যথেষ্ট? না। অডিও কেবল সহায়ক, নিজে পড়াই উত্তম। সারাদিন শুধু অডিও চালিয়ে রাখলে উপকার কম, কষ্ট বেশি।
তাহলে অডিও কখন কাজে আসে? হায়েযের দিনগুলোতে, তিলাওয়াত শুদ্ধ না হলে, সফর বা চাকরির ব্যস্ততায়, যখন প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা রুকইয়াহ দরকার, অমুসলিমের রুকইয়ায়, কিংবা জিন হঠাৎ গলা চেপে ধরলে বা আক্রমণ করলে। ঘুমের সমস্যায় ঘুমের আগে এক ঘণ্টা সূরা ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান ও জিনের তিলাওয়াত শুনতে পারেন।
অডিও শোনা কি বিদআত? না। এটা চিকিৎসার একটি উপায়, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বাঁধা কোনো ইবাদত নয়। মানদণ্ড শুধু এটুকু: শিরক বা হারাম থাকবে না। (মুসলিম ২২০০, আবু দাউদ ৩৮৭৪) আল্লাহর কিতাব দিয়ে চিকিৎসা করতে বলা হয়েছে (ইবনু হিব্বান), আর রাসূলুল্লাহ ﷺ অন্যের তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন (বুখারী ৫০৫০)। আলিমদের মতে রেকর্ড করা তিলাওয়াত শোনার হুকুমও সাধারণ তিলাওয়াত শোনার মতো, তবে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় নয়। (ইসলাম কিউএ, ফতোয়া ১৪৫৯০)
মোবাইলে শুনলে সওয়াব হবে? আদব রক্ষা করে শুনলে হবে, ইন শা আল্লাহ। ভালো নিয়তে বৈধ কাজেও সওয়াব আছে। (মুসলিম ১০০৬)
কোন অডিও ভালো?
- নিজের ওপর করা রুকইয়ার রেকর্ড: সম্ভব হলে নিজের রুকইয়াহ রেকর্ড করে রাখুন, পরে শুনুন। এতে সবচেয়ে বেশি উপকার হয়।
- রুকইয়ার জন্য রেকর্ড করা অডিও: যেমন ruqyahbd.org-এর বদনজর, জাদু ও আয়াতুল হারকের অডিও, কিংবা শাইখ লুহাইদান ও খালিদ আল-হিবশির রুকইয়াহ। এগুলোর প্রভাব তুলনামূলক বেশি।
- সাধারণ তিলাওয়াত: যেমন সূরা তাগাবুন, ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান ও জিন। সূরা বাকারার তিলাওয়াত খুব শক্তিশালী রুকইয়াহ।
ইউটিউব থেকে যাচাই ছাড়া রুকইয়াহ শুনবেন না। সেখানে অন্য ধর্মের এক্সোর্সিজম, শিয়া বা বিদআতিদের শিরকি “রুকইয়াহ” আর টাকা কামানোর জন্য বানানো অর্থহীন অডিও অনেক। কোনো বিজ্ঞ আলিম বা অভিজ্ঞ রাক্বীকে দিয়ে যাচাই করে তবেই শুনুন। গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় রুকইয়ার অডিও শুনবেন না।
রুকইয়ার পর ক্লান্তি, ব্যথা বা বমিভাব হলে কী করবেন, তা জানতে পড়ুন রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা।
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ২৬–৪৬, ৬২–৬৪), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।