duabd

লেখা

জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ

জাদুর বাস্তবতা, ধরন ও লক্ষণ, জাদুকর কবিরাজ চেনার উপায়, তাবিজ ও জাদুর জিনিস নষ্টের নিয়ম এবং জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ ও প্রেসক্রিপশন।

জাদু বা সিহর বাস্তব, কুরআন-হাদীস এর সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু জাদুর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই; আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তা কারও এতটুকু ক্ষতি করতে পারে না। তাই জাদুর ভয়ে দিশেহারা হওয়ার কিছু নেই, আবার জীবনের প্রতিটি সমস্যাকে জাদু ভেবে নেওয়াও ঠিক নয়। এই লেখায় আছে জাদু চেনা, এর ইসলামসম্মত চিকিৎসা, আর কবিরাজের ফাঁদ থেকে বাঁচার উপায়। নির্দিষ্ট ধরনের জাদুর (বিয়ে আটকানো, বিচ্ছেদ, বশ করা ইত্যাদি) রুকইয়াহ পাবেন আলাদা লেখায়: বিভিন্ন ধরনের জাদুর রুকইয়াহ।

যেসব লক্ষণ নিচে আছে, তার অনেকগুলো সাধারণ রোগ, হরমোনের সমস্যা বা মানসিক চাপেও হয়। আগে ডাক্তার দেখান। রুকইয়াহ চিকিৎসার পাশাপাশি চলবে; ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।

জাদু নিয়ে ইসলামী আক্বীদা

  • শয়তানরা মানুষকে জাদু শেখাত; জাদু দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো হতো; তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা কারও ক্ষতি করতে পারত না; আর জাদুচর্চাকারীর জন্য আখিরাতে কোনো অংশ নেই: আল-বাকারা ২:১০২।
  • মূসা (আ.)-এর সামনে ফিরআউনের জাদুকররা মানুষের চোখে জাদু করেছিল, আর আল্লাহর হুকুমে তাঁর লাঠি সেসব গিলে ফেলে: আল-আ‘রাফ ৭:১১৫–১২২। এই আয়াতগুলো তাই জাদুর রুকইয়াহর মূল আয়াত।
  • গিরায় ফুঁ দেওয়া নারীদের (জাদুকরদের) অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে শেখানো হয়েছে: সূরা আল-ফালাক।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে বাঁচতে বলেছেন; শিরকের পরেই তাতে জাদুর উল্লেখ। (বুখারী)
  • লাবিদ ইবনুল আসাম নামের এক ব্যক্তি চিরুনি, চুল ও খেজুর গাছের মোচার খোসায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জাদু করে একটি কূপে রেখেছিল। তিনি দোয়া করলে আল্লাহ বিষয়টি জানিয়ে দেন ও তাঁকে সুস্থ করেন, আর জিনিসগুলো মাটিচাপা দেওয়া হয়। (বুখারী)
  • যে প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খায়, সেদিন বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করে না। (বুখারী)
  • জ্যোতিষবিদ্যার কিছু শেখা মানে জাদুরই একটি শাখা শেখা। (আবু দাউদ ৩৯০৫) যে জাদু করে বা করায়, কুলক্ষণ গণনা করে বা করায়, সে মুসলিমদের দলভুক্ত নয়; আর গণকের কাছে গিয়ে তার কথা বিশ্বাস করা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর নাযিল হওয়া দ্বীনকে অস্বীকার করার শামিল। (মাজমাউয যাওয়াইদ)

ইমাম কুরতুবী, নববী, ইবনু কুদামাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-সহ আহলুস সুন্নাহর আলিমরা একমত যে জাদুর বাস্তব প্রভাব আছে: এর মাধ্যমে মানুষকে শারীরিক-মানসিকভাবে অসুস্থ করা এবং স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো হয়। তাই জাদুকর, গণক, হাত দেখা, ট্যারো কার্ড বা টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য বলা লোকদের কাছে যাওয়া, কাজ করানো বা তাদের কথা বিশ্বাস করা ঈমানের জন্য মারাত্মক।

জাদুর ধরন

লেখক স্পষ্ট করেছেন, এই আলোচনা শুধু সচেতনতা ও চিকিৎসার জন্য। উৎস অনুযায়ী সমাজে প্রচলিত জাদু তিন রকম:

  1. পরোক্ষভাবে শয়তানের সাহায্যে: বিভিন্ন জিনিসের গোপন বৈশিষ্ট্যের অপব্যবহার, যেমন অদ্ভুত উপাদানে তৈরি ‘পড়া’ পানীয়।
  2. সরাসরি জিন-শয়তানের মাধ্যমে: জাদুকর কুফরি ও জঘন্য কাজের মাধ্যমে শয়তানকে খুশি করে, আর শয়তান কোনো জিনকে কাজে লাগায়। এমন জিন প্রায়ই ভয়ে রোগী ছেড়ে যেতে চায় না; রুকইয়াহর সময় তাকে আয়াতুল কুরসী ও তিন কুলের হেফাযতের কথা জানিয়ে অভয় দিতে হয়।
  3. হাতের কারসাজি বা ভেল্কি: আসল জাদু না হলেও এটাও হারাম, কারণ এটা প্রতারণা, আর এর চর্চাকারীরা ধীরে ধীরে শয়তানি জাদুতে জড়িয়ে পড়ে।

কাজের ধরন অনুযায়ী জাদু করা হয়: ভিকটিমের কাপড়, চুল বা নখ ব্যবহার করে; শুধু মন্ত্রে; খাবার-পানীয়তে মন্ত্র ফুঁকে; বাড়ির সামনে বা চলার পথে ‘পড়া’ পানি ফেলে; জিন দিয়ে; মানুষ ও জিন দুজনের ওপর জাদু করে জিনকে শরীরে আটকে রেখে; কিংবা একসাথে একাধিক পদ্ধতিতে। জাদুর জিনিস সাধারণত লুকিয়ে রাখা হয়: মাটিতে পুঁতে, পানিতে ফেলে, উঁচুতে ঝুলিয়ে বা পুড়িয়ে।

তবে জাদু আলাদিনের চেরাগ নয়। জাদুকরকে অনেক নোংরা সাধনা করতে হয়, শয়তানও তাকে ধোঁকা দেয়; শুধু মন্ত্রে করা জাদু সাধারণত দুর্বল। আর আল্লাহর যিকিরে থাকা মানুষের ওপর এর প্রভাব অনেক সীমিত।

কোনো ‘চিকিৎসক’ আপনার ব্যবহৃত কাপড়, চুল বা ছবি চাইলে কখনো দেবেন না। কোনো অতিথি আসার পর কাপড়ের কোণা কাটা পেলে বা চুলসহ চিরুনি হারালে সতর্ক হোন, মাসনূন আমল বাড়িয়ে দিন, আর সমস্যা দেখা দিলে রুকইয়াহ করুন।

জাদু দিয়ে জাদু কাটানো যাবে না: জাদুকর কবিরাজ চেনার লক্ষণ

জাদু দিয়ে জাদুর চিকিৎসা (যাকে ‘নুশরা’ বলা হয়) করা বা করানো দুটোই গুনাহ; মন্ত্রে কুফরি বাক্য থাকলে তা সরাসরি কুফরি, উদ্দেশ্য যত ভালোই হোক। বাস্তবে এমন চিকিৎসায় এক সমস্যা কমলে আরেক সমস্যা শুরু হয়। কেউ কেউ বারবার টাকা নিতে নিজেই আবার জাদু করে, কারণ রোগীর কাপড় ও তথ্য তার হাতেই থাকে। টাকা কম নিলে বা না নিলেও বিভ্রান্ত হবেন না; সে শয়তানের সাহায্য নিচ্ছে, আর আপনার ঈমান ঝুঁকিতে পড়ছে।

নিচের যেকোনো একটি দেখলেই সাবধান হয়ে যান:

  1. রোগীর চুল, রুমাল, ওড়না বা ব্যবহৃত কাপড় চায়, কিংবা মায়ের নাম জানতে চায়।
  2. কাগজে নবী-সাহাবীদের নাম, আয়াত বা নকশা লিখে পোড়াতে বলে।
  3. কিছু লিখে মাটিতে পুঁততে বা উঁচুতে বেঁধে রাখতে বলে।
  4. ‘মনের মানুষ এনে দেওয়া’, প্রেম বা বশ করার তদবির করে।
  5. রোগীকে লজ্জাজনক বা অশ্লীল কিছু করতে বলে।
  6. ‘জিন বোতলে ভরেছি’, ‘অমুক দেশে পাঠিয়েছি’, ‘জিন রক্তে মিশে গেছে’ জাতীয় কথা বলে।
  7. অন্য কারও ওপর জিন হাজির করে কথা বলায়।
  8. গণকের মতো হাত দেখে।
  9. চেহারা দেখেই অতীত-বর্তমানের সমস্যা বলে দেওয়ার দাবি করে।
  10. প্রাণী বা মানুষের হাড় দিয়ে রোগীকে ছোঁয়।
  11. পাখি বা প্রাণী জবাই করতে বলে, রক্ত চায়, উৎসর্গ বা ‘ভোগ’ চায়।
  12. নির্দিষ্ট সময় অন্ধকার ঘরে থাকতে বা পানি ছুঁতে নিষেধ করে।
  13. মন্ত্র পড়ে পেট, হাত বা নাভি থেকে অদ্ভুত জিনিস বের করে দেখায়।
  14. দুর্বোধ্য রহস্যময় নকশা বা সংখ্যার ছক আঁকে।
  15. দোয়ার সাথে শয়তান, ফিরআউন বা অজানা নামের সাহায্য চায়, কিংবা আয়াতের ফাঁকে ফেরেশতা বা জিনের নাম লিখে তাদের কাছে সাহায্য চায়।

অনেকে জোরে কুরআন পড়ে আর আস্তে মন্ত্র পড়ে, ফলে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। দুঃখজনকভাবে কিছু আলেম-নামধারীও না জেনে শিরকি তাবিজ লিখে থাকেন। সবচেয়ে নিরাপদ পথ একটাই: শুধু কুরআনের আয়াত ও রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত দোয়া দিয়ে রুকইয়াহ। কাউকে এসব করতে দেখলে হিকমতের সাথে সতর্ক করুন এবং রুকইয়াহ শারইয়্যাহর কথা জানান।

জাদুর জিনিস বা তাবিজ নষ্ট করার নিয়ম

জাদুর জিনিস বা সন্দেহজনক তাবিজ পেলে যত দ্রুত সম্ভব নষ্ট করুন। দরকার হবে: একটি গামলা বা বালতি, পর্যাপ্ত পানি, সুতা ও গিঁট কাটার জন্য ব্লেড বা কাটার, ঝালাই করা তাবিজ ভাঙার জন্য প্লায়ার্স, আবর্জনা রাখার পাত্র, আর সম্ভব হলে পোড়ানোর ব্যবস্থা।

  1. পাত্রে পানি নিয়ে পড়ুন: জাদু নষ্টের আয়াত: সূরা আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, জাদু বাতিলের আয়াত: সূরা ইউনুস ১০:৮১–৮২, জাদুকরের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ার আয়াত: সূরা ত্বহা ২০:৬৯। এরপর সূরা ফালাক ও নাস তিনবার করে পড়ুন, মাঝে মাঝে পানিতে ফুঁ দিন। আগে থেকে জাদুর রুকইয়াহর বা ডিটক্সের পানি থাকলে সেটাও ব্যবহার করা যায়।
  2. পুরো কাজের সময় মনে মনে সূরা ফালাক ও নাস পড়তে থাকুন। জাদুর জিনিস খালি হাতে ধরবেন না: গ্লাভস ব্যবহার করুন, কিছু না পেলে অন্তত হাতে রুকইয়াহর তেল মেখে নিন।
  3. তাবিজ ভেঙে ভেতরের কাগজ বের করুন; প্লাস্টিক বা বাক্সে মোড়ানো থাকলে খুলে সব আলাদা করুন।
  4. সবকিছু (কাগজ, খোল, মোম, সুতা) কিছুক্ষণ রুকইয়াহর পানিতে ডুবিয়ে রাখুন।
  5. চুল বা সুতায় গিঁট থাকলে তুলে নিয়ে প্রতিটি গিঁট ও বাঁধন কেটে ফেলুন; একটিও অক্ষত রাখবেন না।
  6. কাগজ হলে পানির মধ্যেই কুটি কুটি করে ছিঁড়ুন। রক্তমাখা কিছু থাকলে পানিতে ডুবিয়ে পরিষ্কার করুন।
  7. আংটি বা ধাতব জিনিসে কিছু খোদাই করা থাকলে ঘষে লেখা মুছে ভেঙে ফেলুন, তারপর আবার পানিতে ডোবান।
  8. এরপর পানি থেকে তুলে নষ্ট করুন; তাবিজ, কাপড় বা পুতুল শুকিয়ে পুড়িয়ে ফেলা আরও ভালো।
  9. পানি, ছাই ও আবর্জনা মানুষের চলাচলের পথ থেকে দূরে ফেলুন, অথবা লোকজন যায় না এমন জায়গায় পুঁতে দিন।
  10. কবিরাজের দেওয়া ‘পড়া’ তেল বা আতর রুকইয়াহর পানিতে ঢেলে মিশিয়ে ফেলুন, অথবা জাদুর আয়াত পড়ে ফুঁ দিয়ে ফেলে দিন।

জিনিস খুঁজে পাওয়া না গেলেও বাড়িতে বা আশেপাশে পোঁতা আছে বলে মোটামুটি জানা থাকলে, এই আয়াতগুলো পড়া পানি সেখানে তিন দিন ছিটিয়ে দিন। মনে রাখবেন, জিনিস নিজ হাতে নষ্ট করা দ্রুততম উপায় মাত্র, শর্ত নয়। ধৈর্য ধরে রুকইয়াহ ও দোয়া করলে আল্লাহ নিজেই জাদু নষ্ট করে দেন, যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষেত্রে হয়েছিল।

জাদুর সাধারণ লক্ষণ

  1. হঠাৎ কারও বা কিছুর প্রতি তীব্র ভালোবাসা বা ঘৃণা, যা আগে ছিল না।
  2. কারণ ছাড়া জটিল রোগ, চিকিৎসায় সারে না, বা প্রচণ্ড অসুস্থ অথচ পরীক্ষায় কিছু ধরা পড়ে না।
  3. পরিবারে অকারণে লেগে থাকা ঝগড়া।
  4. অল্প সময়ে দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব বা দ্বীনদারিতে বড় পরিবর্তন।
  5. অদ্ভুত আচরণ, যেমন সাধারণ কাজ একদম করতে না চাওয়া বা নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে যেতে না চাওয়া।
  6. কোমরের দিকে মেরুদণ্ডের নিচে ব্যথা।
  7. সারাক্ষণ মানসিক অশান্তি, বিশেষত বিকেল থেকে মাঝরাত।
  8. প্রায় সবসময় মাথাব্যথা বা পেটব্যথা, ওষুধে তেমন কাজ হয় না।
  9. ঘুম না হওয়া, ঘুমালেও ভয়ের স্বপ্ন।
  10. একই জিনিস বারবার স্বপ্নে দেখা: পানি, আগুন, গাছ, সাপ, বাঘ, শিয়াল, কবরস্থান, পরিত্যক্ত বাড়ি, জঙ্গল; স্বপ্নে কিছু খাওয়া।

অনেক জাদুতে জিন ব্যবহার করা হয় বলে জিন-আক্রান্তের লক্ষণও মিলতে পারে। শুধু লক্ষণ মিলিয়ে নিশ্চিত হবেন না; রুকইয়াহর আয়াত পড়লে বা শুনলে কী প্রতিক্রিয়া হয়, তা দেখে বোঝা যায়।

চিকিৎসার আগে জরুরি কিছু কথা

  • একসাথে একাধিক জাদু থাকতে পারে; ধৈর্য ধরে একটা একটা করে চিকিৎসা করুন। জাদু, জিন ও বদনজর একসাথে থাকলে আগে বদনজরের রুকইয়াহ, তারপর জাদু ও জিনের। জাদুর নিয়তে রুকইয়াহ করলে ভেতরে লুকানো জিনও বেরিয়ে আসে।
  • রুকইয়াহর কারণে সাময়িক বমিভাব, শরীর বা মাথাব্যথা হতে পারে। লেখকের মতে এগুলো দমাতে আলাদা ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই, কিছুদিনে নিজেই কমে আসে। তবে অবস্থা খারাপের দিকে গেলে অবশ্যই ডাক্তার দেখান। দেখুন: রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া।
  • সুস্থ হলে সবাইকে বলে বেড়াবেন না; হিংসুক জানলে আবার জাদু করতে পারে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন আর মাসনূন আমল চালিয়ে যান।
  • ‘কে জাদু করেছে’ জানার জন্য অস্থির হবেন না। এর কোনো শরয়ী আমল নেই, আর স্বপ্ন কোনো বিষয়ের দলিল নয়। রুকইয়াহর সময় জিন কারও নাম বললেও বিশ্বাস করবেন না; খবিস জিন সম্পর্ক নষ্ট করতেই মিথ্যা বলে।
  • শরয়ী রুকইয়াহর পর অনেক সময় জাদুর অনিষ্ট জাদুকরের দিকেই ফিরে যায়।
  • কেউ বারবার জাদু করতে থাকলে আগে রুকইয়াহ ও দোয়া দিয়ে নিজেকে হেফাযত করুন। এরপরও পিছু না ছাড়লে তাহাজ্জুদ বা নফল নামাযের পর জাদুকর ও তার সহযোগী শয়তানদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়; রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযে শয়তানকে আল্লাহর লানত দিয়েছিলেন (মুসলিম ৫৪২)। এটি স্পর্শকাতর বিষয়, এ পর্যন্ত না গিয়ে পারলে না যাওয়াই উত্তম। রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডির দোয়াগুলো দেখতে পারেন।
  • স্বপ্নে শয়তান দেখলে ভয় না পেয়ে তাকে তাড়া করুন; স্বপ্নে জাদুর জিনিস দেখলে সেখানেই নষ্ট করে দিন; নাগালে না পেলে আয়াতুল কুরসী পড়তে থাকুন।
  • জিন দিয়ে করা জাদুতে রাতে হয়রানি হলে জিনের লেখার ‘রাতে জিনের হয়রানি’ অংশটি অনুসরণ করুন।
  • সুস্থ হতে দেরি হলে প্রতিদিন সূরা বাকারা পড়ার অভ্যাস করুন; পুরোটা না পারলে অন্তত ৩০–৪০ মিনিট, সম্ভব হলে দিনের শুরুতে।
  • জাদুর রুকইয়াহয় এই আয়াতগুলো বারবার পড়ুন: আল-বাকারা ২:১০২, আল-আ‘রাফ ৭:১২০, ইউনুস ১০:৮১, ত্বহা ২০:৬৯ ও আল-ফালাক ১১৩:৪। বিসমিল্লাহ শুধু শুরুতে একবার। এত আয়াত কঠিন হলে সূরা আল-ফাতিহা: সর্বোত্তম দোয়া, আয়াতুল কুরসী, বাকারার শেষ দুই আয়াত, ইখলাস, ফালাক ও নাস বারবার পড়ে দীর্ঘক্ষণ রুকইয়াহ করুন। পূর্ণ তালিকা: রুকইয়াহর আয়াতের তালিকা।

রাক্বী অন্যের ওপর যেভাবে রুকইয়াহ করবেন

প্রস্তুতি নিয়ে রোগীর কাছে বসে বলিষ্ঠ স্বরে রুকইয়াহর আয়াত ও দোয়া পড়তে থাকুন। রোগী নারী হলে সাথে মাহরাম থাকবেন, আর গাইরে মাহরামকে স্পর্শ করবেন না। এরপর সাধারণত দুই রকম পরিস্থিতি হয়:

রোগীর ওপর জিন চলে এলে

  • জিনের রুকইয়াহর নিয়মে তাকে চিরতরে চলে যেতে বাধ্য করুন। জাদুর কাজে নিয়োজিত জিন চলে গেলে অনেক সময় জাদুও নষ্ট হয়, তবু এরপর কয়েক মাস রোগী নিজে রুকইয়াহ চালিয়ে যাবেন।
  • কথা বলা গেলে জানতে চান: কেন, কী দিয়ে জাদু করা হয়েছে, জিনিসগুলো কোথায়। জিন মিথ্যুক, তবু কাউকে পাঠিয়ে খোঁজ নিন। পাওয়া গেলে ওপরের নিয়মে পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করুন।
  • খাবারে বা পথে ‘পড়া’ পানি দিয়ে জাদু হলে রোগী প্রেসক্রিপশন মেনে এক মাস পর জানাবেন। জায়গা অস্পষ্টভাবে বললে আয়াত পড়া পানি সেখানে তিন দিন ছিটান।
  • জিন কারও নাম বললে বিশ্বাস করবেন না।

জিন আসে না, কিন্তু কষ্ট হয়

খুব অস্বস্তি, মাথা-ঘাড়-পিঠে ব্যথা, কান্না, কাঁপুনি বা বমিভাব হলে বুঝতে হবে জিন ছাড়া অন্য পন্থায় জাদু হয়েছে। আরও দু-একবার রুকইয়াহ করে দেখুন। লক্ষণ থাকলে জাদুর আয়াত পড়া পানি পান করান। বমির সাথে কিছু বের হলে বা লাল-কালো বমি হলে আশা করা যায় জাদু নষ্ট হয়েছে। তারপর প্রেসক্রিপশন দিন এবং এক মাস পর আপডেট নিন; প্রয়োজনে আবার রুকইয়াহ বা নির্দিষ্ট জাদুর প্রেসক্রিপশন।

নিজে নিজে জাদুর রুকইয়াহ

শুরুর আগে পাকা নিয়ত করুন: সমাধান না হওয়া পর্যন্ত থামবেন না। কয়েকদিনে আগ্রহ হারানো বা সামান্য উন্নতিতে বন্ধ করা চলবে না। মানসিক সাপোর্ট দেওয়ার মতো কেউ পাশে থাকলে ভালো।

  1. ভালোভাবে পবিত্র হয়ে দুই রাকাত নফল নামায পড়ুন; তাহাজ্জুদের সময় হলে সবচেয়ে উত্তম।
  2. দুই হাত তুলে আরোগ্যের জন্য দোয়া করুন; ইস্তিগফার ও দরূদ পড়ে শুরু করুন।
  3. হাতের কাছে এক বোতল পানি রাখুন।
  4. কয়েকবার রুকইয়াহর আয়াত তিলাওয়াত করুন, অথবা কোনো ক্বারীর সাধারণ রুকইয়াহ কয়েকবার শুনুন।
  5. এরপর জাদু নষ্টের আয়াত: সূরা আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, জাদু বাতিলের আয়াত: সূরা ইউনুস ১০:৮১–৮২ ও জাদুকরের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ার আয়াত: সূরা ত্বহা ২০:৬৯ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে কিছুটা পান করুন।
  6. তারপর নিচের প্রেসক্রিপশন মেনে চলুন।

মাথা বা পেটব্যথা, ঘাড়-পিঠে ব্যথা, ভেতরে ছটফট, অকারণ কান্না বা বমিভাব হতে পারে; বমি হলে ভালো। জাদুর জিনিসের সন্ধান চেয়ে তাহাজ্জুদে আল্লাহর কাছে দোয়াও করতে পারেন।

প্রেসক্রিপশন: জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ

আল-আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, ইউনুস ১০:৮১–৮২, ত্বহা ২০:৬৯, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস: প্রতিটি তিনবার করে পড়ে একটু বেশি পরিমাণ পানিতে ফুঁ দিন। এটিই ‘জাদুর কমন রুকইয়াহ’, নির্দিষ্ট জাদুর প্রেসক্রিপশনেও এর বাকি অংশ মানতে হয়।

  1. এই পানি প্রতিদিন দুই-তিন বেলা আধা গ্লাস করে পান করুন।
  2. প্রতিদিন গোসলের পানিতে কিছুটা মিশিয়ে গোসল করুন। পানি ফুরালে শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারেন এমন যে কেউ আবার পড়ে দিতে পারেন।
  3. প্রতিদিন একটানা অন্তত ৪৫ মিনিট রুকইয়াহর নিয়তে তিলাওয়াত: রুকইয়াহর আয়াত, সূরা বাকারা, বা ওপরের আয়াতগুলো বারবার। এতক্ষণ না পারলে যতটুকু পারেন পড়ুন, আর প্রতিদিন অন্তত দেড় ঘণ্টা রুকইয়াহর অডিও শুনুন।
  4. মুভি, গান ও সব হারাম থেকে দূরে থাকুন; নারীরা শরয়ী পর্দা মেনে চলুন।
  5. পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঠিকমতো; কোনো ফরজ-ওয়াজিব যেন না ছোটে।
  6. সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল; অন্তত তিন কুলের আমল কখনো বাদ নয়। দেখুন: হেফাযতের মাসনূন আমল।
  7. প্রতিদিন সকালে ১০০ বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু; সকালে না পারলে দিনের মধ্যে পূর্ণ করুন, একান্ত না পারলে সকাল-সন্ধ্যায় ১০ বার করে।
  8. ঘুমের আগে তিন কুল পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে বুলিয়ে নিন, এভাবে তিনবার; তারপর আয়াতুল কুরসী পড়ে ঘুমান।
  9. ওযু-গোসল ও পবিত্রতায় সচেতন থাকুন, বিশেষ করে ফরজ গোসলে।
  10. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরূদ; তাহাজ্জুদ ও নফল নামায পড়ে মুক্তির জন্য দোয়া।

কিছু পরামর্শ

  • বরই পাতার গোসল: সমস্যা বেশি হলে সপ্তাহে ২–৩ দিন করতে পারেন। ৭টি বরই পাতা বেটে পানিতে গুলিয়ে নিন। আয়াতুল কুরসী এবং ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। কিছুটা পান করুন, বাকিটা দিয়ে গোসল করুন। এই পানির সাথে অন্য পানি মেশাবেন না।
  • চিকিৎসার সময় সমস্যা কখনো বাড়ে, কখনো কমে। শত্রু জাদু করেই জেতে না; আপনি হাল ছেড়ে দিলে তবেই সে জেতে। তাই পুরো সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত থামবেন না।
  • বেশি কষ্ট হলে রুকইয়াহর পানি দিয়ে গোসল করে নিন।
  • ‘এখন আর সমস্যা নেই’ মনে হলেও আরও মাসখানেক স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যান।
  • এক মাস পরও সমস্যা থাকলে সবকিছু খেয়াল করে নতুন করে শুরু করুন। একাধিক জাদু থাকলে একসাথে সবগুলোর নিয়তে না করে একেকটির নিয়তে আলাদা করে রুকইয়াহ করলে দ্রুত উপকার আশা করা যায়।
  • যিনি পাশে থেকে সাহায্য করছেন, প্রতি সপ্তাহ শেষে তার সাথে অবস্থা পর্যালোচনা করুন।

তাবিজ, ‘বাটি চালান’, ‘পানি পড়া’ বা জিন হাজির করা কবিরাজের কাছে কখনো যাবেন না, যত বিপদেই পড়ুন। আল্লাহর কালাম ও সবর দিয়েই জাদু কাটে, ইন শা আল্লাহ।

সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ১৩৯–১৬৫), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।

আরও পড়ুন

রুকইয়াহ কী?রুকইয়াহ শারইয়্যাহর অর্থ, জায়িয হওয়ার তিন শর্ত, রুকইয়ার তিন স্তর, জরুরি পরিভাষা এবং কেন প্রত্যেক পরিবারে কারো না কারো রুকইয়াহ জানা দরকার।লেখাসুন্নাহসম্মত রুকইয়াহর ১০টি পদ্ধতিশুধু তিলাওয়াত, হাত রেখে পড়া, ফুঁ, হালকা থুতু, হাত বুলানো, পানি-লবণ, মাটি ও টানা কয়েক দিন: হাদীসে আসা রুকইয়ার দশটি পদ্ধতি ও প্রয়োগের নিয়ম।লেখারুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদানরুকইয়ার আগে ঘর ও মন প্রস্তুত করা, রুকইয়ার পানি, যমযম, মধু, কালোজিরা, বরই পাতা, রুকইয়ার গোসলের নিয়ম এবং রুকইয়ার অডিও নিয়ে জরুরি প্রশ্নোত্তর।লেখানিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?সত্তর হাজারের হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা, কখন নিজে আর কখন অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ করাবেন, ভালো রাক্বীর বৈশিষ্ট্য এবং জাদুকর কবিরাজ চেনার লক্ষণ।লেখারুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝারুকইয়ার পর ক্লান্তি, ব্যথা বা বমি হলে কী করবেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন, সুস্থ হতে কেন দেরি হয় এবং কীভাবে বুঝবেন রুকইয়াহ সত্যিই শেষ।লেখাবদনজর: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসাবদনজর সত্য, তবে এর চিকিৎসা সহজ। লক্ষণ, প্রতিদিনের সুরক্ষা আর ওযুর পানি, দোয়া ও রুকইয়ার গোসলসহ চারটি পদ্ধতি ধাপে ধাপে।লেখাজিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসাজিনের আসর কেন ও কখন হয়, কীভাবে চিনবেন ও বাঁচবেন, আর কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতিতে কীভাবে রুকইয়াহ করবেন: শান্ত ও বিস্তারিত নির্দেশনা।লেখাবাড়িতে জিনের সমস্যা হলেবাড়িতে অস্বাভাবিক আওয়াজ, ছায়া বা জিনিস সরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে কী করবেন: কারণ, পাঁচটি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি ও পরে যা মেনে চলবেন।লেখাবিভিন্ন ধরনের জাদুর রুকইয়াহবিয়ে আটকানো, বিচ্ছেদ, বশ করা, পাগল বানানো, বান মারা, ইস্তিহাযা, সহবাসে অক্ষমতা ও গর্ভপাতের জাদু: প্রতিটির লক্ষণ ও দিনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন।লেখাওয়াসওয়াসা রোগ: মুক্তির উপায়ওযু-নামায নিয়ে সন্দেহ, ঈমান নিয়ে অবাঞ্ছিত চিন্তা বা কুমন্ত্রণা? পাত্তা না দেওয়ার কৌশল, মাসনূন দোয়া, রুকইয়াহ ও কখন ডাক্তার দেখাবেন।লেখাসাধারণ অসুস্থতায় রুকইয়াহব্যথা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা, চোখ, তোতলামি, শ্বাসকষ্ট, হাড়ক্ষয় ও ক্লান্তিতে ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত রুকইয়ার নিয়ম।লেখাশিশুদের রুকইয়াহশিশুর রুকইয়াহ সহজ: কোলে নিয়ে মাথায় হাত রেখে মাসনূন দোয়া ও তিন কুল। তাবিজ-টিপ ছাড়া সুরক্ষা, কখন বদনজর, আর যা কখনো করবেন না।লেখাআল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্সপানি, অলিভ অয়েল, মধু ও কালোজিরায় রুকইয়াহ পড়ে সাত দিনের পূর্ণ রুটিন: উপকরণ, প্রস্তুতি, রাত-সকালের নিয়ম ও সতর্কতা।লেখাসার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রামসমস্যা কয়েক রকম, বুঝতে পারছেন না কোন রুকইয়াহ লাগবে? প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ ও প্রতি মাসের একটি সাধারণ রুকইয়াহ রুটিন।লেখাজাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমলসকাল-সন্ধ্যা, ঘুমের আগে ও দিনের বিভিন্ন সময়ের সুন্নাহসম্মত আমল: কোনটা কখন, কতবার পড়বেন, জাদু, জিন ও বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য।লেখারুকইয়াহর আয়াতের তালিকাসাধারণ রুকইয়াহর ২০টি আয়াত, আয়াতে শিফা, আয়াতুল হারক, আর জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা ও অসুস্থতার জন্য আলাদা আয়াত: কীভাবে পড়বেন সহ।লেখা