জিন আল্লাহর এক বাস্তব সৃষ্টি। তারা মানুষের ক্ষতি করতে পারে, এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে বেশিরভাগ অসুখ, দুঃস্বপ্ন বা মন খারাপের পেছনে জিন থাকে না। তাই এই লেখা পড়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। উদ্দেশ্য হলো: সমস্যা সত্যিই থাকলে যেন আপনি কবিরাজের কাছে না গিয়ে কুরআন-সুন্নাহর পথে এর সমাধান করতে পারেন।
মৃগী, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, হ্যালুসিনেশন, অনিদ্রা, অস্বাভাবিক আচরণ: এগুলোর বেশিরভাগই শারীরিক বা মানসিক রোগের লক্ষণ হতে পারে। আগে ডাক্তার ও প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। রুকইয়াহ চিকিৎসার পাশাপাশি চলবে, চিকিৎসার বদলে নয়। ডাক্তারের দেওয়া কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।
জিনের আসর: আক্বীদা সংক্ষেপে
কুরআনে প্রায় নব্বই জায়গায় জিনের কথা এসেছে, এমনকি ‘সূরা আল-জিন’ নামে পূর্ণ একটি সূরাও আছে। আহলুস সুন্নাহর স্বীকৃত আলিমরা একমত যে জিন মানুষকে কষ্ট দিতে, শরীরে ভর করতে, অসুস্থ করতে এবং মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তার কোনো ক্ষমতাই আল্লাহর অনুমতির বাইরে নয়।
- সুদখোরকে কিয়ামতের দিন এমনভাবে দাঁড় করানো হবে, যেন শয়তান তাকে স্পর্শ করে উন্মাদ করে দিয়েছে: আল-বাকারা ২:২৭৫। এ থেকে আলিমরা বুঝেছেন, শয়তানের স্পর্শে মানুষ অসুস্থ ও বিকারগ্রস্ত হতে পারে।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, শয়তান মানুষের শরীরে রক্তের মতো চলাচল করে। (মুসলিম ২১৭৪)
- উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) নামাযে বিভ্রান্ত হতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বুকে হাত দিয়ে মৃদু আঘাত করলেন, মুখে হালকা থুতু দিলেন এবং তিনবার বললেন: শয়তানকে বের হওয়ার আদেশ: উখরুজ আদুওয়াল্লাহ। এরপর সমস্যা আর ফেরেনি। (ইবনু মাজাহ ৩৫৪৮)
- সাত বছর ধরে জিনে ধরা এক শিশুকে রাসূলুল্লাহ ﷺ একইভাবে জিন বের হয়ে যেতে আদেশ করেন এবং শিশুটি সুস্থ হয়। (মুসতাদরাকে হাকিম, মুসনাদে আহমাদ)
- এক সাহাবী শিকলে বাঁধা এক মানসিক রোগীর ওপর কয়েকদিন সূরা ফাতিহা পড়ে রুকইয়াহ করেন, সে সুস্থ হয়। (আবু দাউদ ৩৪২০)
- ইবনু মাসউদ (রা.) এক মৃগী রোগীর কানে সূরা মুমিনূনের শেষ আয়াতগুলো (২৩:১১৫–১১৮) পড়েছিলেন বলে বর্ণনা আছে; এর সনদকে কেউ হাসান, কেউ দুর্বল বলেছেন। (মাজমাউয যাওয়াইদ) পরবর্তী যুগের আলিমরাও এই আয়াত দিয়ে রুকইয়াহ করেছেন।
জিনের আসরের ধরন
- পুরো শরীরে আসর: জিন রোগীর মুখ দিয়ে কথা বলে।
- মস্তিষ্কে আসর: স্নায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে রাগ, হাসি-কান্না বা কোনো অঙ্গ অবশ করে দেয়। সাধারণত জাদুর মাধ্যমে হয়। শক্তিশালী জিন হলে বারবার রুকইয়াহ লাগে।
- নির্দিষ্ট অঙ্গে আসর: হাত, পা বা মাথায় দীর্ঘ ব্যথা বা অবশ ভাব, যার কারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। এটাও প্রায়ই জাদুর সাথে যুক্ত।
- স্বল্প সময়ের আক্রমণ: ক্ষতি করে চলে যায়, নির্দিষ্ট সময়ে আবার আসে। ঘুম আর জাগরণের মাঝে বোবায় ধরাকে কোনো কোনো আলিম এর মধ্যে গণ্য করেছেন। প্রতিরোধ: ঘুমের আগের মাসনূন আমল।
- জিনের নজর (প্রচলিত ভাষায় ‘বাতাস লাগা’): শিশুরা হঠাৎ ভয় পায় ও কাঁদে, বড়রা ছায়া দেখে, ঘুমাতে পারে না। কয়েকদিন বদনজরের রুকইয়াহ যথেষ্ট। বারবার হলে ভালোভাবে রুকইয়াহ ও নিয়মিত মাসনূন আমল দরকার।
কেউ কেউ নিজেকে জিনে ধরা ভেবে অজান্তেই জিন-আক্রান্তের মতো আচরণ করেন। এটা মানসিক সমস্যা, যার সমাধান মানসিক চিকিৎসা এবং ওয়াসওয়াসার রুকইয়াহ। রুকইয়াহ করলেই সাধারণত পার্থক্য বোঝা যায়।
জিন কেন ও কখন আক্রমণ করে
বইয়ে সাতটি কারণ বলা হয়েছে:
- জাদুকর বা কবিরাজ জাদু-তাবিজের মাধ্যমে জিন পাঠায় (‘জিন চালান’)।
- বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি জিনের আকর্ষণ।
- প্রতিশোধ: না জেনে জিনের গায়ে গরম পানি ফেলা, জিনের আবাস এমন গাছ কাটা, সাপরূপী জিন মারা।
- পুরোনো শত্রুতা, যেমন বাপ-দাদার আমলে কোনো জিন মারা পড়েছিল।
- ভুলবশত: অন্যের জন্য পাঠানো জিন ভুল মানুষকে ধরে।
- নোংরা বা নাপাক জায়গায় যাওয়া, অথবা দীর্ঘ সময় নাপাক থাকা।
- মাঝরাত, সন্ধ্যা বা ভরদুপুরে নির্জন মাঠ, ফাঁকা রাস্তা বা ছাদে থাকা।
বাস্তবে প্রথম, দ্বিতীয় ও শেষ কারণটি বেশি দেখা যায়। মনে রাখবেন, জিন নিজের কারণ বলতে গিয়েও মিথ্যা বলে। অকারণে জিনকে কষ্ট দেওয়া হারাম। ঘরে সাপ দেখলে আগে তিন দিন চলে যেতে সতর্ক করার নির্দেশ হাদীসে আছে। (মুসলিম)
জিন চাইলেই যে কাউকে ধরতে পারে না। চার অবস্থায় মানুষ বেশি অরক্ষিত থাকে: প্রচণ্ড ভয়ে, প্রচণ্ড রাগে, আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন অবস্থায় এবং অশ্লীল গুনাহে (যিনা, পর্নোগ্রাফি) লিপ্ত অবস্থায়। যে আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য শয়তানকে সঙ্গী করে দেওয়া হয়: আয-যুখরুফ ৪৩:৩৬–৩৭। একবার আক্রান্ত হলে পরে জাদু, নজর ও ওয়াসওয়াসার প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়, তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো।
জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে ১৫টি আমল
- জামাআতের সাথে নামায।
- গানবাজনা, নাটক-সিনেমা ও পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে থাকা।
- পবিত্র থাকা, ওযু করে ঘুমানো।
- সব কাজে বিসমিল্লাহ: ঘরে ঢোকা-বের হওয়া, খাওয়া, অন্ধকারে যাওয়া, ওপর থেকে কিছু নিচে ফেলা।
- অকারণে কুকুর, বিড়াল বা সাপ না মারা; একান্ত দরকার হলে আগে তিনবার পর্যন্ত তাড়িয়ে দেওয়া।
- মাগরিবের সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখা ও শিশুদের ঘরে রাখা; বিসমিল্লাহ বলে দরজা বন্ধ করা ও পাত্র ঢেকে রাখা। (বুখারী)
- গর্তে প্রস্রাব না করা।
- ঘরে ঢোকা ও বের হওয়ার দোয়া: ঘরে প্রবেশের সময়, ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া; অন্তত বিসমিল্লাহ।
- বিসমিল্লাহ বলে দরজা-জানালা বন্ধ করা; ঘুমের সময় দরজা বন্ধ রাখা।
- স্বামী-স্ত্রীর মিলনের আগের দোয়া: স্বামী-স্ত্রী মিলনের আগে।
- টয়লেটে ঢোকার দোয়া: টয়লেটে প্রবেশের দোয়া।
- সকালে ১০০ বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু; না পারলে ফজর ও আসরের পর ১০ বার করে।
- ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২:২৮৫–২৮৬)।
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির নিয়মিত করা; বিস্তারিত: জাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমল।
- তিন কুল: ঘুমের আগে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস একবার করে পড়ে দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে বুলিয়ে নেওয়া, এভাবে তিনবার; আর ফজর ও মাগরিবের পর প্রতিটি তিনবার করে পড়া।
শিশু বা অসুস্থ কেউ নিজে পড়তে না পারলে অন্য কেউ পড়ে তাকে ফুঁ দেবেন।
জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
এক-দুই দিনের কোনো লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। দীর্ঘদিন ধরে অনেকগুলো লক্ষণ একসাথে থাকলে সন্দেহ করা যায়, আর নিশ্চিত হতে হয় রুকইয়াহ করে।
ঘুমের মধ্যে
- অনিদ্রা, অস্থিরতা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া।
- প্রায়ই বোবায় ধরা।
- ঘুমের মধ্যে চিৎকার, গোঙানো, হাসা বা কাঁদা।
- ঘুমের মধ্যে হাঁটা (গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ)।
- স্বপ্নে কুকুর, বিড়াল, সাপ, বাঘ, শিয়াল, গরু-মহিষের মতো প্রাণীকে আক্রমণ করতে দেখা।
- উঁচু থেকে পড়ে যাওয়া, কবরস্থান, পরিত্যক্ত জায়গা বা অস্বাভাবিক লম্বা-খাটো মানুষ দেখা।
জাগ্রত অবস্থায়
- ইবাদতে অনীহা; কুরআন তিলাওয়াত বা আযান সহ্য করতে না পারা (গুরুত্বপূর্ণ)।
- দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, যা চোখ-কান-দাঁতের কারণে নয় এবং ওষুধে কমে না।
- অস্থির মেজাজ, তুচ্ছ কারণে রাগ বা কান্না।
- হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া, দাঁতে দাঁত লেগে খিঁচুনি, মৃগীর মতো অবস্থা।
- অস্বাভাবিক আচরণ, কথা বলার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো।
- কোনো অঙ্গে দীর্ঘ ব্যথা বা অবশ ভাব, যার কারণ ডাক্তার খুঁজে পান না।
- প্রচণ্ড অলসতা ও শরীর ভারী লাগা।
- মা শিশুকে দুধ খাওয়াতে না চাওয়া, বা শিশু দুধ খেতে না চাওয়া।
- হ্যালুসিনেশন এবং অদ্ভুত ঘটনা ঘটা।
এই তালিকার অনেকগুলোই শারীরিক বা মানসিক রোগের লক্ষণ, বিশেষ করে মৃগী, খিঁচুনি ও হ্যালুসিনেশন। আগে চিকিৎসা নিন। দীর্ঘদিনেও সমাধান না হলে তখন রুকইয়াহ করে দেখুন।
এক নজরে জিনের রোগীর রুকইয়াহ
- রাক্বী ও রোগী দুজনেই ওযু করবেন। সাথে অন্তত একজন সহকারী থাকবেন; রোগী নারী হলে তার মাহরাম পুরুষ।
- রোগীর কাছে বসে কানের কাছে জোরে পড়ুন: আয়াতুল কুরসী, আস-সাফফাত ৩৭:১–১০ এবং আল-জিন ৭২:১–৯। প্রতিটি বাক্য কয়েকবার করে পড়ুন।
- পাশে পানির পাত্র রাখুন। পড়ে পানিতে ফুঁ দিন, সেই পানি রোগীর মুখে ও হাত-পায়ে ছিটান এবং কয়েক চুমুক পান করান।
- রোগী ‘মরে গেলাম’ বলে চিৎকার করলেও থামবেন না; কষ্টটা জিনের।
- জিন কথা বললে গল্পে কান দেবেন না, শুধু চলে যেতে বলুন। রাজি হলে বলুন: আল্লাহর নামে বের হয়ে যা, ওয়াদা কর আর কখনো আসবি না।
- প্রথম দিনে না গেলে টানা কয়েকদিন প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা রুকইয়াহ করুন। বারবার রুকইয়াহয় জিন দুর্বল হয়ে পালায়।
বিস্তারিত পদ্ধতি
প্রস্তুতি ও তিলাওয়াত
প্রথমে রুকইয়াহর প্রস্তুতি নিন। তারপর রোগীর কানের কাছে জোরে রুকইয়াহর প্রসিদ্ধ আয়াতগুলো পড়ুন।
- রোগী পুরুষ বা আপনার মাহরাম হলে মাথায় বা শোয়া অবস্থায় কপালে হাত রেখে পড়তে পারেন। এতে প্রভাব বেশি হয়, তবে পুরো সময় হাত রাখা জরুরি নয়।
- গাইরে মাহরাম নারীকে স্পর্শ করা হারাম। শুধু কাছে বসে জোরে পড়ুন। চাইলে তার মাহরাম পুরুষ রোগীর মাথায় হাত রাখবেন, আর আপনি তার হাতের ওপর হাত রাখবেন।
- পড়ার মাঝে এমনভাবে ফুঁ দিন যেন সামান্য থুতুও যায়।
- রুকইয়াহর আয়াত ও আয়াতুল হারক (জাহান্নাম ও আযাবের আয়াত) পড়ে পানি তৈরি করুন; মাঝে মাঝে মুখে-হাত-পায়ে ছিটান ও পান করান।
- নিয়ত রাখুন: জিন চলে যাক এবং রোগী পুরো সুস্থ হোক। জিন এসে গল্প করুক, এমন ইচ্ছা রাখবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করেছেন (বুখারী), আর শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু (বনী ইসরাঈল ১৭:৫৩)।
- সময়: সাধারণত কমপক্ষে ৪০–৪৫ মিনিট, প্রয়োজনে ২–৩ ঘণ্টা বা আরও বেশি। রোগীর অবস্থা দেখে ঠিক করবেন।
জিন থাকলে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়
হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢাকা বা অদ্ভুতভাবে তাকানো; পুরো শরীর ঝাঁকুনি দেওয়া; কোনো অঙ্গ বা পেশি লাফানো; গোঙানো; চিৎকার করে থামতে বলা; কারও নাম-ঠিকানা বলা বা গালি দেওয়া; দাঁতে দাঁত লেগে নিথর বা অচেতন হয়ে যাওয়া। জিন কথা বলুক বা চুপ থাকুক, পড়া চালিয়ে যান এবং মনে মনে আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকুন।
জিন কথা বললে
- সংক্ষেপে জানতে পারেন: নাম ও ধর্ম, কেন ধরেছে, সাথে আর কেউ আছে কি না, কোনো জাদুকরের হয়ে কাজ করে কি না। জিন প্রচুর মিথ্যা বলে, তাই সব বিশ্বাস করবেন না। আসল কাজ চলে যেতে আদেশ করা।
- মুসলিম জিন হলে আখিরাতের শাস্তি ও জান্নাতের কথা মনে করিয়ে দিন; মুমিনকে কষ্ট দেওয়া আল্লাহ নিষেধ করেছেন (আল-আহযাব ৩৩:৫৮)।
- অমুসলিম জিন হলে হিকমতের সাথে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারেন, তবে চাপাচাপি নয়; ইসলাম গ্রহণের নাটকও হতে পারে।
- কারণ অনুযায়ী বোঝান: ভালো লেগেছে বলে ধরে থাকলে বলুন এটা হারাম; ভুলবশত কষ্ট পেলে বলুন, সে তোমাকে দেখতে পায়নি।
ওয়াদা ও বের হওয়া
রাজি হলে তাকে দিয়ে এভাবে শপথ করান: আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি, এখনই এই শরীর থেকে চলে যাব, আর কখনো আসব না, অন্য কোনো মুসলমানের ওপরও আসর করব না; করলে আমার ওপর আল্লাহর অভিশাপ। অন্তত এতটুকু বলাতে চেষ্টা করুন: আল্লাহর নামে ওয়াদা করছি, এখন চলে যাব, আর আসব না। এক-দুই বা পাঁচ মাসের জন্য যেতে চাইলে মানবেন না; হয় চিরতরে, নয়তো রুকইয়াহ চলতেই থাকবে।
হাত বা পায়ের দিক দিয়ে বের হতে বলুন; মাথা, চোখ, পেট বা বুক দিয়ে নয়। চলে যাওয়ার পর আবার আয়াত পড়ে যাচাই করুন, অথবা রোগীকে আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক ও নাস পড়তে বলুন। দুর্বল হলে আপনি ৩–৪ শব্দ করে পড়বেন, রোগী শুনে শুনে বলবে। জিন লুকিয়ে থাকলে এতে প্রকাশ পায়।
জিন সহজে না গেলে
- প্রথমে সতর্ক করুন: না গেলে কুরআনের আয়াতে শাস্তি পাবে, আখিরাতে জাহান্নাম। পড়া চালিয়ে যান।
- এরপর কঠোর হোন: আয়াতুল হারক, জিন-শয়তান সংক্রান্ত আয়াত, সূরা তাওবা ও আনফালের কিতালের কিছু আয়াত, সূরা ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান ও জিনের শুরুর অংশ, আল-হাশর ৫৯:২১–২৪, সূরা আ‘লা, হুমাযাহ ও ফীল পড়ুন।
- পড়া শেষে হালকা ফুঁ দিন, পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করান, তেলে ফুঁ দিয়ে হাত-পা ও মাথায় মালিশ করতে বলুন।
- শরীরের যে জায়গা লাফায় বা যেখানে ব্যথা জমে, সেখানে মুরব্বিদের হাত-পা টেপার মতো হালকা চাপ দিয়ে পড়ুন। গাইরে মাহরাম হলে এ কাজ তার মাহরাম আত্মীয় করবেন।
- জিন রাজি হলে পড়া থামিয়ে ওয়াদা নিন এবং যাওয়ার সুযোগ দিন।
রোগীকে মারধর করবেন না, শিশুকে তো কখনোই নয়। মার জিনের গায়ে লাগলেও জিন চলে গেলে ব্যথা রোগীর শরীরেই থাকে; অনেক জিন মারের আগেই সরে যায় আর পুরো আঘাত রোগী পায়; আর ক্ষতি হলে দায় আপনার। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে চিকিৎসা না জেনে চিকিৎসা করে, ক্ষতির দায় তার। (আবু দাউদ ৪৫৮৬) জিনের ওপরও জুলুম করা হারাম। ধৈর্য না থাকলে অন্যের ওপর রুকইয়াহ করতে যাবেন না।
রাক্বীর জন্য জরুরি কিছু কথা
- রাক্বীর নিরাপত্তা: শিরক ও জুলুমমুক্ত, সুন্নাহসম্মত রুকইয়াহয় জিন রাক্বীর ক্ষতি করবে না, ইন শা আল্লাহ। তাবিজ ব্যবহারকারী বা এক জিন দিয়ে আরেক জিন তাড়ানো লোকদের ওপরই সাধারণত প্রতিশোধ আসে। তবু রাক্বী আয়াতুল কুরসী, তিন কুল ও নামাযে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন, গুনাহ থেকে বাঁচবেন এবং সামর্থ্যের বাইরের কেস হাতে নেবেন না (আল-বাকারা ২:২৮৬)।
- লক্ষণ মেলে, প্রথম রুকইয়াহয় মাথা ঘোরা বা দম আটকে আসে, কিন্তু জিন কথা বলে না: আরও ২–৩ বার রুকইয়াহ করুন। তারপর নিচের চিকিৎসা-পরবর্তী পরামর্শের সাথে তিনটি কাজ দিন: প্রথমে ৭ দিনের ডিটক্স রুকইয়াহ; এরপর অন্তত এক মাস প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ ঘণ্টা রুকইয়াহ শোনা (সূরা বাকারা, ৮ সূরার রুকইয়াহ অর্থাৎ ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান, জিন, যিলযাল, ইখলাস, ফালাক, নাস; সাথে আলে ইমরান, তাওবা, কাহফ, হা-মীম সাজদা, রহমান, মুলক, তাকভীর, ইনফিতার, বুরূজ, তারিক, আ‘লা ও শেষ ১৫ সূরা); আর প্রতিদিন সূরা বাকারার ৫০–১০০ আয়াত বা এক পারা তিলাওয়াত। এক মাস পর আবার দেখুন।
- জিন চিৎকার বা হুমকি দিলে ভয় পাবেন না; শান্ত থেকে কানের কাছে কয়েকবার শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল: সূরা নিসা ৪:৭৬ পড়ুন ও ফুঁ দিন, পানিতে ফুঁ দিয়ে ছিটিয়ে দিন।
- গালি দিলে উত্তেজিত হবেন না; প্রশংসা করলে আত্মতুষ্ট হবেন না; ‘কিছুই হবে না’ বললে পাত্তা না দিয়ে পড়তে থাকুন।
- অন্য কোনো জিন সাহায্যের প্রস্তাব দিলে ফিরিয়ে দিন: আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। স্বপ্নে গুপ্তধন বা সম্পদের লোভ দেখালে সে ফাঁদে পা দেবেন না।
- জিন রোগীর গলা টিপতে, খামচি দিতে বা নিজেকে আঘাত করাতে পারে। উপস্থিতদের সতর্ক রাখুন, আশেপাশে আঘাত করার মতো কিছু রাখবেন না।
- শুধু কাঁধ-পিঠে ব্যথা, বমি ভাব বা অকারণ কান্না হলে এবং রোগী তা সামলাতে না পারলে জাদুর সন্দেহ করুন। কানের কাছে জাদুর আয়াত পড়ুন: জাদু নষ্টের আয়াত: সূরা আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, জাদু বাতিলের আয়াত: সূরা ইউনুস ১০:৮১–৮২, জাদুকরের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ার আয়াত: সূরা ত্বহা ২০:৬৯। প্রতিক্রিয়া বাড়লে ২–৩ সপ্তাহ জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ, তারপর প্রয়োজনে নির্দিষ্ট জাদুর রুকইয়াহ।
- শিশুর রুকইয়াহয় তার আরাম ও নিরাপত্তা আগে; দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসিয়ে রাখবেন না, আগে-পরে গল্প করে সহজ করুন। দেখুন: শিশুদের রুকইয়াহ।
- জিন শর্ত দিলে: নামায, পর্দার মতো শরীয়তসম্মত শর্ত আল্লাহর বিধান হিসেবে মানা যায়; গুনাহ, উৎসর্গ বা ভোগের শর্ত কখনো নয়।
- জিন চলে যাওয়ার ভান করতে পারে। মাথায় অস্বাভাবিক কাঁপুনি, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বা কোনো অঙ্গ অবশ থাকলে আবার রুকইয়াহ করুন।
- ওয়াদার সময় পালাতে চাইলে আর-রহমান ৫৫:৩৩–৩৬ বারবার পড়ুন।
- রাজি কিন্তু বের হতে পারছে না: কানে আযান দিন, পুরো সূরা ইয়াসীন পড়ুন, আবার আযান দিন। জাদুর কারণে আটকে থাকলে কিছুদিন জাদুর রুকইয়াহ ও সম্ভব হলে তিন দিন বরই পাতার গোসলের পর আবার রুকইয়াহ।
- ‘আমরা ৪০ জন আছি’ জাতীয় হুমকিতে কান দেবেন না; সবাইকে চলে যেতে বলুন। পরে আবার রুকইয়াহ করলে বোঝা যাবে আর কেউ আছে কি না।
- এক দিনে না গেলে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে চালিয়ে যান। কখনো এক সপ্তাহ, কখনো কয়েক মাস লাগে। প্রতিদিন সম্ভব না হলে পরামর্শগুলোর সাথে রুকইয়াহর পানি, রুকইয়াহর গোসল এবং মাসে এক-দুইবার ডিটক্স রুকইয়াহ।
- প্রথম কয়েকদিন সমস্যা বাড়তে পারে; ভয়ে থামবেন না। জিন চলে গেলেও সব লক্ষণ দূর না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যান। দেখুন: রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা।
বইয়ের বাস্তব ঘটনাগুলো থেকে দুটি শিক্ষা: জিন চলে যাওয়ার পরও কিছুদিন রুকইয়াহ না চালালে সে ফিরে আসতে পারে; আর রোগীর শরীরে কবিরাজের তাবিজ থাকলে জিন সহজে যায় না, তাই তা খুলে নিয়মমতো নষ্ট করতে হয় (দেখুন জাদুর লেখায়)।
চিকিৎসার পর যা মেনে চলবেন
জিন চলে যাওয়ার পর আবার আক্রমণ ঠেকাতে অন্তত দেড় মাস এগুলো গুরুত্ব দিয়ে মানুন:
- প্রতিদিন অন্তত দেড়-দুই ঘণ্টা তিলাওয়াত শোনা: সূরা বাকারা, ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান, জিনের রুকইয়াহ, তিন কুলের রুকইয়াহ ও আয়াতুল হারক; অথবা নিজে কিছুক্ষণ তিলাওয়াত।
- সপ্তাহে কয়েকদিন রুকইয়াহর গোসল।
- ফজরের পর ১০০ বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু।
- সকালে সূরা ইয়াসীন, রাতে সূরা মুলক পড়া বা শোনা; ঘুমের সমস্যা থাকলে ঘুমের আগে ৮ সূরার রুকইয়াহ শোনা।
- সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল অল্প হলেও প্রতিদিন: তিন কুল, ওযু করে ঘুমানো, আয়াতুল কুরসী।
- রাতে একা না ঘুমানো; বিয়ের উপযুক্ত হলে দ্রুত বিয়ে করা।
- কয়েক মাস প্রতি ৩ দিনে একবার ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত; না পারলে অন্য কেউ, একান্ত না হলে অডিও।
- নারীরা শরীয়তসম্মত পর্দা, পুরুষরা জামাআতে নামায।
- গানবাজনা, নাটক-সিনেমা ও মন্দ সঙ্গ থেকে দূরে থাকা।
- সব ভালো কাজে বিসমিল্লাহ বলার অভ্যাস।
রাতে জিনের হয়রানি
জিন বা জাদুতে আক্রান্ত কেউ কেউ রাতে ঘুমের মধ্যে, কখনো জাগ্রত অবস্থাতেও, খবিস জিনের অশালীন হয়রানির শিকার হন। নারীদের মধ্যে বেশি, তবে পুরুষদেরও হয়। লজ্জায় অনেকে কাউকে বলতে পারেন না।
পরিবারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কথা: এটা আক্রান্ত মানুষটির কোনো চারিত্রিক দোষ নয়, এবং এটা বাস্তবের অপরাধের মতো কিছু নয়। তাকে সন্দেহ বা তিরস্কার করবেন না, পাশে থাকুন। সঠিকভাবে রুকইয়াহ করলে আল্লাহর রহমতে দ্রুত মুক্তি মেলে। যাদের শুধু এ ধরনের স্বপ্ন হয় বা অস্বাভাবিক ঘনঘন স্বপ্নদোষ হয়, তারাও এই পরামর্শে উপকার পাবেন।
- ঘর থেকে গুনাহের সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলুন, যেন রহমতের ফেরেশতা আসেন।
- নামায ও দোয়ায় অবহেলা করবেন না; পুরুষ মসজিদে জামাআতে, নারী ঘরে সময়মতো।
- সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল প্রতিদিন; পিরিয়ডের দিনগুলোতেও এসব যিকির বাদ দেবেন না।
- ঘুমের আগে সম্ভব হলে রুকইয়াহর গোসল, নইলে অন্তত ওযু; ওযুর পানিতে আয়াতুল কুরসী ও তিন কুল পড়ে ফুঁ দিলে আরও ভালো।
- এক থেকে দেড় মাস প্রতিদিন কয়েকবার, বিশেষ করে ঘুমের আগে, ‘রুকইয়াহ যিনা’ শুনুন বা সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো পড়ুন (অডিও, আয়াতের তালিকা)।
- রুকইয়াহর আয়াত পড়ে অলিভ অয়েলে ফুঁ দিন; ঘুমের আগে মাথার তালু ও শরীরে মালিশ করুন।
- ঘুমানোর সময় বা হঠাৎ ঘুম ভাঙলে মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ুন: ঘুমের মধ্যে ভয় পেলে বা অস্থির লাগলে, শত্রু বা ক্ষতিকর মানুষের ভয়ে, শত্রুর বিরুদ্ধে: আল্লাহুম্মা মুনযিলাল কিতাব।
- আক্রমণ টের পেলেই উঠে নফল নামায বা দোয়ায় দাঁড়িয়ে যান।
- সম্ভব হলে রাতে একা ঘুমাবেন না।
- প্রয়োজন হলে ফরজ গোসলে অবহেলা করবেন না; মাসআলা আলিমের কাছ থেকে জেনে নিন।
কোনো অবস্থাতেই কবিরাজ, তান্ত্রিক বা ‘জিনের সাহায্যে চিকিৎসা’ করা লোকের কাছে যাবেন না। তাবিজ, পানি পড়া, সাত ঘাটের পানি, হাত দেখা বা কাগজ পোড়ানোর ধোঁয়ায় সমস্যা বাড়ে, ঈমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভালো রাক্বী চেনার উপায় জানতে পড়ুন: নিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে? বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে দেখুন: বাড়িতে জিনের সমস্যা হলে।
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ৯১–১৩৪), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।