সাহাবীদের যুগেও ঘরে জিনের উপদ্রবের ঘটনা ঘটেছে, তাই বিষয়টি কাল্পনিক নয়। আবার রাতের প্রতিটি শব্দ বা হারানো জিনিসের পেছনে জিন খোঁজাও ঠিক নয়। ইঁদুর-বিড়াল, বাতাস, পানির পাইপ, বিদ্যুতের লাইনের ত্রুটি কিংবা পরিবারের কারও ভুলে যাওয়ার অভ্যাসের মতো সাধারণ কারণগুলো আগে দেখে নিন। এরপরও যদি একাধিক অস্বাভাবিক ঘটনা বারবার ঘটে, তখন নিচের পদ্ধতিগুলো শান্তভাবে অনুসরণ করুন।
বাড়িতে জিনের উপস্থিতির লক্ষণ
- ছায়া বা কোনো আকৃতি দৌড়ে যেতে দেখা।
- রাতে বা বাড়ি খালি থাকলে রান্নাঘর, অন্য ঘর বা ছাদ থেকে আওয়াজ আসা।
- ফাঁকা ঘর বা ছাদ থেকে নাম ধরে ডাক শোনা।
- যে মানুষ বাইরে আছে, তাকে বাড়িতে দেখতে পাওয়া।
- অকারণে কল বা শাওয়ার চালু হওয়া, লাইট-ফ্যান জ্বলা-নেভা, দরজা-জানালা খোলা-বন্ধ হওয়া।
- জিনিসপত্র এলোমেলো হওয়া বা জায়গা বদলে যাওয়া।
- অকারণে গ্লাস বা আয়না ভাঙা।
- অদ্ভুতভাবে জিনিস হারিয়ে যাওয়া।
- ঘুমের মধ্যে কাঁথা-কম্বল টেনে নেওয়া।
- রাতে আশেপাশের কুকুরের অস্বাভাবিক ঘেউ ঘেউ।
এক-দুটি ঘটনা দেখে আতঙ্কিত হবেন না, বিশেষ করে শিশুদের সামনে এসব নিয়ে ভয়ের গল্প করবেন না। শিশু ভয় পেলে তাকে আশ্বস্ত করুন এবং তার ওপর শিশুদের রুকইয়াহর নিয়মে দোয়া পড়ে দিন।
কেন এমন হয়
লেখকের অভিজ্ঞতায় সাধারণত তিনটি কারণ থাকে, আর কারণ অনুযায়ী পদ্ধতি বেছে নিতে হয়:
- জায়গাটি দীর্ঘদিন বিরান বা জঙ্গল ছিল, সেখানে জিনেরা বসতি গড়েছিল। এ ক্ষেত্রে নিচের প্রথম তিনটি পদ্ধতি সাধারণত যথেষ্ট।
- আগের বাসিন্দারা শয়তানি জাদুচর্চা করত, অথবা কবিরাজের দেওয়া ‘বাড়ি বন্ধ’ করার তাবিজ, নকশা বা সরঞ্জাম বাড়িতে রয়ে গেছে। তখন প্রথম তিনটির সাথে চতুর্থ পদ্ধতিও লাগবে।
- বাড়ির কাউকে জিন দিয়ে জাদু করা হয়েছে, বা কেউ নিজেই জিন-আক্রান্ত। তখন আগে সেই মানুষটির চিকিৎসা করতে হবে (দেখুন জিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসা এবং জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ), এরপর প্রয়োজনে বাড়ির জন্য নিচের পদ্ধতিগুলো।
প্রথম পদ্ধতি: আল্লাহর নামে চলে যেতে বলা
- আরও দুজন মানুষ সাথে নিন।
- বাড়িতে উঁচু আওয়াজে কয়েকবার এই ঘোষণা দিন, আরবীতে এবং বাংলায়: বাড়ি থেকে জিনকে চলে যাওয়ার ঘোষণা।
- বাংলায় এর মর্ম: “সুলাইমান (আ.) তোমাদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, তার দোহাই দিয়ে বলছি, আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। আল্লাহর নামে বলছি, তোমরা বের হয়ে যাও এবং কাউকে কষ্ট দিয়ো না।”
- বাড়ির মালিক নিজে বললে সবচেয়ে ভালো।
- পরপর তিন দিন এভাবে ঘোষণা দিন। এরপরও সমস্যা থাকলে দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
এই ঘোষণাটি মাসনূন দোয়া নয়, বইয়ে এর কোনো হাদীস-সূত্রও দেওয়া হয়নি। এটি আল্লাহর নামে জিনদের চলে যেতে বলার একটি বৈধ কথা মাত্র। সতর্ক করে চলে যেতে বলার ধারণাটি হাদীসেও আছে: ঘরে সাপ দেখলে আগে তিন দিন সতর্ক করার নির্দেশ এসেছে, কারণ তা জিনও হতে পারে। (মুসলিম)
দ্বিতীয় পদ্ধতি: দোয়া ও সূরা সাফফাত পড়া পানি
- প্রথমে বাড়ি থেকে আল্লাহর অবাধ্যতার সব জিনিস সরিয়ে ফেলুন: প্রাণীর ছবি, মূর্তি বা ভাস্কর্য, ঝুলিয়ে রাখা তাবিজ ইত্যাদি।
- একটি বালতি বা বড় পাত্রে পর্যাপ্ত পানি নিন।
- মুখ পানির কাছে এনে এই দোয়াটি পড়ুন এবং পানিতে ফুঁ দিন: বাড়ি থেকে জিন-শয়তান দূর করতে পানিতে পড়ার দোয়া (ইবনুল কাইয়্যিমের উদ্ধৃত)।
- এরপর শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয়: আউযু বিল্লাহিস সামী‘ইল আলীম … মিন হামযিহী এবং বিসমিল্লাহসহ সূরা আস-সাফফাতের প্রথম ১০ আয়াত (৩৭:১–১০) পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। লেখকের মতে সাথে আয়াতুল কুরসী-ও পড়া উচিত।
- এই পানি দরজা-জানালাসহ পুরো বাড়ির ভেতরে ও বাইরে ছিটিয়ে দিন।
- লেখকের পরামর্শ: পানি ছিটানো শেষে বাড়িতে উচ্চস্বরে আযান দিন।
- প্রয়োজনে কয়েকদিন এটি করতে পারেন।
এই পদ্ধতি ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যিব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন; শাইখ বিন বায (রহ.) এবং শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালামও এর কথা উল্লেখ করেছেন। একদল আলিমের মতে একা না পড়ে দুই-তিনজন মিলে পড়ে পানিতে ফুঁ দেওয়া বেশি উপকারী।
তৃতীয় পদ্ধতি: পরপর তিন দিন সূরা বাকারা
জিনের উপদ্রব আছে এমন বাড়িতে পরপর তিন দিন সূরা বাকারা তিলাওয়াত করুন। নতুন বাড়িতে ওঠার পর তিন দিন এটা করলে আগে থেকে থাকা জিন বা ক্ষতিকর কিছু থাকলে চলে যায়, ইন শা আল্লাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে যায়। (মুসলিম ৭৮০)
সমস্যা মিটে যাওয়ার পরও মাঝে মাঝে, সপ্তাহে বা মাসে কয়েকবার, সূরা বাকারা পড়ুন। নিজে পড়া সবচেয়ে উত্তম; একান্ত কষ্টকর হলে তিলাওয়াতের রেকর্ড চালাতে পারেন।
চতুর্থ পদ্ধতি: জাদু-কবিরাজির সরঞ্জাম থাকলে
সমস্যার কারণ যদি হয় বাড়িতে রাখা তাবিজ-কবচ, নকশা, কবিরাজের দেওয়া ‘বাড়ি বন্ধ’ করার জিনিস, অথবা আগের বাসিন্দার কুফরি জাদুচর্চা, তাহলে:
- পুরো বাড়ি ও আশপাশ ভালোভাবে খুঁজে জাদু-কবিরাজির সব সরঞ্জাম এক জায়গায় জড়ো করুন।
- সেগুলো জাদুর জিনিস নষ্ট করার নিয়মে নষ্ট করুন। খালি হাতে ধরবেন না। ধাপগুলো বিস্তারিত দেওয়া আছে: জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ।
- এরপর বালতি বা বড় পাত্রে পানি নিয়ে পড়ুন: আগের দোয়াটি বাড়ি থেকে জিন-শয়তান দূর করতে পানিতে পড়ার দোয়া (ইবনুল কাইয়্যিমের উদ্ধৃত), আয়াতুল কুরসী, সূরা সাফফাতের প্রথম ১০ আয়াত, জাদুর আয়াতগুলো জাদু নষ্টের আয়াত: সূরা আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, জাদু বাতিলের আয়াত: সূরা ইউনুস ১০:৮১–৮২, জাদুকরের চক্রান্ত ব্যর্থ হওয়ার আয়াত: সূরা ত্বহা ২০:৬৯, আর সবশেষে সূরা ফালাক ও নাস কয়েকবার।
- পানিতে ফুঁ দিয়ে পুরো বাড়িতে ছিটিয়ে দিন।
- পরপর তিন দিন এটি করুন।
জাদুর জিনিস খুঁজে পাওয়া না গেলেও বাড়িতে বা আশপাশে পোঁতা আছে বলে মোটামুটি জানা থাকলে, জাদুর আয়াতগুলো পড়া পানি ওই জায়গায় তিন দিন ছিটিয়ে দিন।
পঞ্চম পদ্ধতি: ছোটখাটো উপদ্রবে আযান
সমস্যা জটিল না হলে, যেমন শুধু ছাদে বা রাতে রান্নাঘরে আওয়াজ হয়, তাহলে পরপর তিন দিন বাড়িতে উচ্চস্বরে আযান দিন, আর বাড়ির সবাই প্রতিদিনের মাসনূন আমল ঠিকমতো করুন। চাইলে প্রথম পদ্ধতিটিও করতে পারেন। পথে বা নির্জন জায়গায় ভূতুড়ে কিছু বিভ্রান্ত করলেও আযান দেওয়ার নির্দেশনা হাদীসে এসেছে: ভূতুড়ে কিছু ঘটলে বা পথ ভুলালে আযান দেওয়া।
পদ্ধতিগুলো চলার সময় পরিবারের সবার জন্য
- বাড়ির সবাই সকাল-সন্ধ্যার যিকির এবং ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসী ও তিন কুলের আমল করবেন। শিশুরা নিজে না পারলে বড়রা পড়ে তাদের ফুঁ দেবেন।
- যিনি বেশি ভয় পাচ্ছেন, সম্ভব হলে রাতে তাকে একা ঘুমাতে দেবেন না।
- রাতে হঠাৎ ভয় পেলে বা ঘুম ভেঙে গেলে পড়ুন: ঘুমের মধ্যে ভয় পেলে বা অস্থির লাগলে।
- পরিবারের কারও মধ্যে ঘুমে হাঁটা, অকারণ অজ্ঞান হওয়া বা কুরআন সহ্য না হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে, বাড়ির পাশাপাশি তার নিজের জন্যও রুকইয়াহ করুন এবং প্রয়োজনে ডাক্তার দেখান।
সমস্যা মিটে গেলে যা মেনে চলবেন
শয়তান যেন আবার এখানে বাসা না বাঁধে, সেজন্য বাড়ির পরিবেশ বদলানোই আসল সমাধান:
- বাড়িকে গানবাজনা থেকে মুক্ত রাখুন।
- প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্য ঘরে টাঙাবেন না। যে ঘরে কুকুর বা প্রাণীর ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না। (বুখারী)
- নফল ও সুন্নাত নামায সম্ভব হলে ঘরে পড়ুন। তাহাজ্জুদ মাঝে মাঝে বাড়ির অন্য ঘরগুলোতেও পড়ুন; পরিবারের নারীরাও যেন মাঝে মাঝে অন্য ঘরে নামায পড়েন।
- মাঝে মাঝে সূরা বাকারা তিলাওয়াত চালু রাখুন।
- ঘরে ঢোকা-বের হওয়ার দোয়া পড়ুন: ঘরে প্রবেশের সময়, ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া।
- মাগরিবের সময় বিসমিল্লাহ বলে দরজা-জানালা বন্ধ করুন, শিশুদের ঘরে রাখুন, রাতে পাত্র ঢেকে রাখুন। (বুখারী)
- সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনূন আমল পরিবারের সবাই নিয়মিত করুন। বিস্তারিত: জাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমল।
‘বাড়ি বন্ধ’ করার জন্য কবিরাজ, পীর-ফকির বা তান্ত্রিকের কাছে যাবেন না, আর তাদের দেওয়া তাবিজ, পেরেক, নকশা বা ‘পড়া’ জিনিস বাড়িতে রাখবেন না। এগুলোই অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনো জিনের সাহায্য নিয়ে জিন তাড়ানোও নাজায়েয। কুরআন, সুন্নাহ আর আল্লাহর ওপর ভরসাই যথেষ্ট।
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ১০৬–১০৮, ১৩৪–১৩৮), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।