duabd

লেখা

বদনজর: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

বদনজর সত্য, তবে এর চিকিৎসা সহজ। লক্ষণ, প্রতিদিনের সুরক্ষা আর ওযুর পানি, দোয়া ও রুকইয়ার গোসলসহ চারটি পদ্ধতি ধাপে ধাপে।

কারও সুন্দর চেহারা, সুস্থ সন্তান, নতুন বাড়ি বা ব্যবসার উন্নতি দেখে কেউ মুগ্ধ বা ঈর্ষান্বিত হলো, অথচ আল্লাহর নাম নিল না: এভাবেই সাধারণত বদনজর লাগে। এটা কুসংস্কার নয়, কুরআন-হাদীস দিয়ে প্রমাণিত বাস্তবতা। সুখবর হলো, জিন বা জাদুর তুলনায় বদনজরের চিকিৎসা অনেক সহজ, নিজেই করা যায় এবং সাধারণত অল্প দিনেই উপকার পাওয়া যায়, ইন শা আল্লাহ।

বদনজর কী?

কোনো ভালো জিনিসের প্রতি হিংসা বা অতিরিক্ত মুগ্ধতা নিয়ে তাকানোর ফলে আল্লাহর অনুমতিতে যে ক্ষতি হয়, তা-ই বদনজর। আলিমরা বলেছেন, এর মূল উৎস অন্তর: হিংসা বা মুগ্ধতা মনে জন্মায়, তারপর চোখের মাধ্যমে প্রভাব ফেলে। তাই কয়েকটি বিষয় মনে রাখুন:

  • নজর সাধারণত অনিচ্ছায় লাগে। যিনি নজর দিয়েছেন, তিনি খারাপ মানুষ নাও হতে পারেন; এমনকি বদরী সাহাবীর নজরও লেগেছিল।
  • নিজের নজর নিজের ওপর, নিজের সন্তান ও সম্পদের ওপরও লাগতে পারে।
  • মানুষের মতো জিনেরও নজর লাগে। আমাদের দেশে একে অনেকে “বাতাস লাগা” বলে।
  • কিছু জাদুকর ইচ্ছাকৃতভাবে নজর লাগানোর কাজ করে; টাকা দিয়ে কাউকে দিয়ে কুনজর দেওয়ানো কুফরি জাদুরই অংশ।
  • সাধারণত দুর্লভ বা চোখে পড়ার মতো জিনিসে নজর বেশি লাগে, যেমন সাধারণ পাড়ায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি।

তবে প্রতিটি কুদৃষ্টিই লক্ষ্যে পৌঁছায় না। যিনি নিয়মিত মাসনূন দোয়া-যিকিরে নিজেকে সুরক্ষিত রাখেন, তিনি সহজে আক্রান্ত হন না।

কুরআন-হাদীসে বদনজর

ইয়াকুব (আ.) ছেলেদের মিসরে এক দরজা দিয়ে না ঢুকে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে ঢুকতে বলেছিলেন। ইবনু আব্বাস (রা.)-সহ মুফাসসিরদের মতে কারণ ছিল নজর লাগার আশঙ্কা। একই আয়াতে শেখানো হয়েছে: সতর্কতা নেওয়া বৈধ, কিন্তু ভরসা আল্লাহর ওপরই। (ইউসুফ ১২:৬৭–৬৮) মক্কার কাফিররাও নবী ﷺ-কে চোখের দৃষ্টিতে আছড়ে ফেলতে চেয়েছিল। (আল-কলম ৬৮:৫১)

হাদীসে এসেছে:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বদনজর সত্য। (বুখারী ৫৭৪০, মুসলিম ২১৮৭)
  • তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারে এমন কিছু থাকলে তা হতো বদনজর; আর তোমাদের গোসল করতে বলা হলে গোসল করবে। (মুসলিম ২১৮৮)
  • আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদীরের পর আমার উম্মতের সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাবে বদনজরে। (মুসনাদে আবু দাউদ ত্বয়ালিসী ১৮৫৮; সনদ হাসান)
  • বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও, কারণ বদনজর সত্য। (ইবনু মাজাহ ৩৫০৮)
  • রাসূল ﷺ জিন ও মানুষের নজর থেকে আশ্রয় চাইতেন; সূরা ফালাক ও নাস নাযিল হলে এ দুটিকেই গ্রহণ করেন। (তিরমিযী ২০৫৮, ইবনু মাজাহ ৩৫১১)
  • উম্মু সালামা (রা.)-এর ঘরে এক মেয়ের চেহারায় নজরের ছাপ দেখে তিনি তার জন্য রুকইয়াহ করাতে বললেন। (বুখারী ৫৭৩৯, মুসলিম ২১৯৭)

সাহল ইবনু হুনাইফ (রা.)-এর ঘটনাটি বিশেষ শিক্ষণীয়: আমির ইবনু রবীআ (রা.) তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসা করার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসূল ﷺ বললেন, “তুমি বরকতের দোয়া করলে না কেন?” তারপর আমিরকে ওযু করিয়ে সেই পানি সাহলের গায়ে ঢালা হলো, আর তিনি সুস্থ হয়ে গেলেন। (মুয়াত্তা মালিক; ইবনু মাজাহ ৩৫০৯) এ কারণেই পছন্দের কিছু দেখলে বরকতের দোয়া করা উচিত: পছন্দের কিছু দেখলে (বদনজর থেকে বাঁচাতে)।

বদনজর মৌলিক আকীদার বিষয় না হলেও কুরআন, হাদীস ও ইজমা দিয়ে প্রমাণিত; একে অস্বীকার করা ঈমানের জন্য ক্ষতিকর।

বদনজর যেভাবে ক্ষতি করে

রাসূল ﷺ বদনজরকে তাকদীরের সাথে তুলনা করেছেন। এটি ছোট উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়ে জটিল রোগ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এর ফলে জ্বর, পেটের সমস্যা, একের পর এক অসুখ, কাজে লোকসান, ফসল বা গাছের ক্ষতি হতে পারে; কেউ কেউ দীর্ঘ হতাশায় (ডিপ্রেশনে) ভোগেন।

বদনজরের লক্ষণ

  • জ্বর জ্বর লাগে, কিন্তু থার্মোমিটারে ধরা পড়ে না; কষ্ট আছে, অথচ মেডিকেল টেস্টে কিছু আসে না।
  • একের পর এক নানা রকম অসুখ লেগেই থাকে।
  • সর্দি-কাশি, জ্বর, ডায়রিয়ার মতো সাধারণ রোগ দীর্ঘ চিকিৎসাতেও সারে না, ওষুধে কাজ হয় না।
  • পড়াশোনা বা কাজে মন বসে না; নামায-যিকিরে আগ্রহ কমে যায়।
  • শরীর প্রায়ই দুর্বল, বমি বমি ভাব; সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব আর হাই ওঠা।
  • চেহারা মলিন, ফ্যাকাসে বা হলদেটে; মুখে লাল ছোপ ছোপ দাগ।
  • ক্ষুধামন্দা, খাবারে অরুচি; অকারণে মেজাজ খারাপ বা কান্না আসা।
  • বুক ধড়ফড়, দম বন্ধ লাগা; কাঁধ ভারী, মাথা ঝিম ধরে থাকা।
  • পেটে অতিরিক্ত গ্যাস বা অস্বাভাবিক চুল পড়া, ওষুধে তেমন উপকার না হওয়া।
  • হাত-পায়ে ব্যথা, বা ব্যথা শরীরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানো; মাংসে গুটলির মতো অনুভূতি।
  • আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে দেখা করতে ভালো না লাগা।
  • ব্যবসা-চাকরিতে লেগে থাকা ঝামেলা; যে কাজে দক্ষ, সেটাতেই বাধা আসা বা অসুস্থ হয়ে পড়া।
  • স্বপ্নে শুধু চোখ খোলা রেখে মুখ ঢাকা কাউকে, বা লাল চোখের মানুষ দেখা; মৃত মানুষ বা নিজেকে মৃত দেখা।

সব লক্ষণ মিলতে হবে না: অল্প মিললে সমস্যা কম, বেশি মিললে বেশি। স্বপ্নের বিষয়গুলো বারবার দেখলে তবেই গুরুত্ব দিন; মাঝেমধ্যে দেখলে “আউযু বিল্লাহ” বলে চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। নজরের লক্ষণের সাথে যদি বাচ্চাদের অকারণ ভয় ও অস্বাভাবিক কান্না, বড়দের আশেপাশে কারও উপস্থিতি টের পাওয়া, ঘুম না হওয়া বা ওয়াসওয়াসা বেড়ে যাওয়া যুক্ত হয়, তবে সম্ভবত জিনের নজর।

এই লক্ষণগুলোর প্রায় সবই সাধারণ শারীরিক বা মানসিক অসুখেও হতে পারে। তাই লক্ষণ মিললেই বদনজর ধরে নেবেন না, ডাক্তারের পরামর্শ ও চিকিৎসা চালিয়ে যান, আর পাশাপাশি রুকইয়াহ করুন। কোনো অবস্থায় চলমান ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।

রুকইয়ার সময় যেসব প্রতিক্রিয়া হতে পারে

বদনজর থাকলে রুকইয়াহ করা বা শোনার সময় প্রচুর ঘুম বা ক্লান্তি, বারবার হাই ওঠা, হাত-পা শিরশির করা, শরীর চুলকানো বা ঘেমে যাওয়া, আর রুকইয়ার পর প্রস্রাব হলুদ হওয়া দেখা যেতে পারে। সবার সব হবে না; তবে রুকইয়ার সময় খুব ঘুম পাওয়া এবং পরে প্রস্রাব হলুদ হওয়া সাধারণত নজরের দিকেই ইঙ্গিত করে। লক্ষণ শুনে নিশ্চিত হতে না পারলে কিছুদিন রুকইয়াহ করেই দেখুন। আরও জানতে: রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা।

বদনজর থেকে বাঁচার উপায়

আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রতিরোধ সবচেয়ে ভালো। প্রতিদিনের জন্য:

  1. সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে পড়ুন: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু (আবু দাউদ ৫০৮৮, তিরমিযী ৩৩৮৮)
  2. সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে পড়ুন: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাত (মুসলিম ২৭০৯)
  3. সকাল-সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস ৩ বার করে: তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (আবু দাউদ ৫০৮২, তিরমিযী ৩৫৭৫)
  4. নিজের ও সন্তানদের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ুন: সন্তানদের হেফাযতের দোয়া। রাসূল ﷺ এ দোয়া পড়ে হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে ফুঁ দিতেন। (বুখারী ৩৩৭১) অন্যের জন্য পড়লে “আউযু”-র জায়গায় একজনের জন্য “উঈযুকা”, দুজনের জন্য “উঈযুকুমা”, অনেকের জন্য “উঈযুকুম” বলা ভালো: সন্তানদের হেফাযতের দোয়া। তবে নিয়ত করে “আউযু” বললেও সমস্যা নেই।
  5. বাচ্চাদের মাঝে মাঝে সূরা ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিন। এর জন্য কোনো তাবিজ-কবচ বা নজর-টিপের প্রয়োজন নেই।

আচরণে যা খেয়াল রাখবেন:

  • কথাবার্তায় আল্লাহর যিকির রাখুন। কিছু পছন্দ হলে “মা শা আল্লাহ, লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বা বরকতের দোয়া বলুন: মা শাআল্লাহু লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। (এ বিষয়ে আনাস (রা.)-এর বর্ণনাটির সনদ দুর্বল; তবে কথাটি সূরা কাহফ ১৮:৩৯-এ আছে)
  • কেউ আপনার কিছুর প্রশংসা করে যিকির না করলে আপনি নিজেই “আলহামদুলিল্লাহ” বা “মা শা আল্লাহ” বলুন। প্রসঙ্গক্রমে নিজের নিয়ামতের কথা বললেও যিকির যোগ করুন।
  • মেয়েরা শরীয়তসম্মত পর্দা মেনে চলুন।
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সন্তান, খাবার বা সাফল্যের ছবি-ভিডিও দেখানো এড়িয়ে চলুন। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শিশুর ভিডিও পোস্টের পর অস্বাভাবিক কান্না শুরু হয়েছে, আর ফালাক-নাস দিয়ে রুকইয়ার পর থেমেছে।
  • আয়, সন্তান, স্বামী/স্ত্রীর প্রশংসা বা পরিকল্পনার কথা অপ্রয়োজনে সবার সামনে বলবেন না; প্রয়োজন পূরণে গোপনীয়তা রাখুন।
  • বেশি বেশি সালাম দিন; এতে পারস্পরিক হিংসা কমে। (মুসলিম ৫৪)
  • সর্বোপরি বদনজর থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান। দোয়া করার পর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।

চিকিৎসা: চারটি পদ্ধতি

প্রথম পদ্ধতি: নজরদাতার ওযুর পানি

কার নজর লেগেছে জানা গেলে সাহল (রা.)-এর হাদীস অনুসরণ করাই যথেষ্ট।

  1. যার নজর লেগেছে বলে মনে হচ্ছে, তাকে ভদ্রভাবে ওযু করতে অনুরোধ করুন।
  2. ওযুর পানি একটি পাত্রে জমা করুন। কুলির পানি নেওয়া জরুরি নয়; সাধারণত হাত-মুখ ধোয়া পানিই যথেষ্ট।
  3. সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির গায়ে ঢেলে দিন।
  4. সাধারণত একবারেই কাজ হয়; প্রয়োজনে ২–৩ দিন করুন।

অনেকের ক্ষেত্রে পানি ঢালার পর জোরে পায়খানা বা প্রস্রাবের বেগ আসে, তারপর সুস্থ লাগে। নিজের নজর নিজের লাগলে নিজেই ওযু করে পানি জমিয়ে নিজের গায়ে ঢালুন, অথবা চতুর্থ পদ্ধতি অনুসরণ করুন। এক পরিবারে বাচ্চার নজরের সমস্যায় বাবা-মা নিজেরা ওযুর পানি ঢেলে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে বাচ্চা স্বাভাবিক হয়েছিল।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: মাথায় হাত রেখে দোয়া ও সূরা

  1. রোগীর মাথায় হাত রেখে পড়ুন: সন্তানদের হেফাযতের দোয়া
  2. তারপর: জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি আরকীক
  3. তারপর: জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি ইউবরীক
  4. তারপর: আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ
  5. এরপর সূরা ফাতিহা, এবং সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস ৩ বার করে। চাইলে ফালাক-নাস কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করুন।
  6. ঐচ্ছিকভাবে এই আয়াতগুলোও পড়তে পারেন: আন-নিসা ৪:৫৪, ইউসুফ ১২:৬৭, আল-কাহফ ১৮:৩৯, আল-মুলক ৬৭:৩–৪, আল-কলম ৬৮:৫১–৫২।
  7. পড়ার মাঝে মাঝে রোগীর গায়ে ফুঁ দিন। পুরো পাঠটি কয়েকবার করুন।

নিজের জন্য করলে পড়ে হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলিয়ে নিন। সমস্যা বেশি হলে শেষে সবগুলো আরেকবার পড়ে পানিতে ফুঁ দিন; সেই পানি সকাল-বিকাল পান করুন এবং গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করুন, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন। ছোট বাচ্চাদের নানা সমস্যা বা অসুখেও এই পদ্ধতি কাজে লাগে।

গায়রে মাহরাম (যাকে স্পর্শ করা জায়েয নয়) কারও ওপর রুকইয়াহ করলে মাথায় হাত রাখবেন না; শুধু পড়বেন এবং দূর থেকে ফুঁ দেবেন, অথবা পানিতে পড়ে দেবেন।

তৃতীয় পদ্ধতি: গাছ, দোকান, বাড়ি ও পশুপাখি

  1. গাছ, খামার, দোকান, ব্যবসা বা বাড়িতে নজর লাগলে প্রথমে মালিক নিজের জন্য বদনজরের রুকইয়াহ করবেন।
  2. তারপর দ্বিতীয় পদ্ধতির দোয়া ও সূরাগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
  3. সেই পানি গাছে, ঘরে বা দোকানে ছিটিয়ে দিন।
  4. পোষা পশুপাখির ক্ষেত্রে মাথায় হাত রেখে পড়ুন, অথবা খাবারে পড়ে ফুঁ দিয়ে খাওয়ান।
  5. প্রয়োজনে পরপর কয়েকদিন করুন।

চতুর্থ পদ্ধতি: রুকইয়াহ শোনা ও রুকইয়ার গোসল

কার নজর লেগেছে জানা না গেলে, সমস্যা দীর্ঘদিনের হলে বা অনেকের নজর লেগেছে মনে হলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করুন। এতে দুটি কাজ:

  1. প্রতিদিন রুকইয়াহ: সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রুকইয়ার আয়াত তিলাওয়াত করুন বা শুনুন। অডিও শুনলে দিনে অন্তত ৪৫ মিনিট, ভালো হয় ঘণ্টাখানেক। বদনজরের রুকইয়াহ (Evil Eye / Eye Hasad নামে পরিচিত) বা শাইখ লুহাইদানের রুকইয়াহ শুনতে পারেন, অথবা নিজে নজরের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে রেকর্ড করে শুনতে পারেন। জিনের নজর প্রকট মনে হলে সাথে সূরা ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান ও জিন-এর রুকইয়াহও শুনুন।
  2. রুকইয়ার গোসল: সম্ভব হলে প্রতিদিন, নইলে অন্তত একদিন পরপর।

রুকইয়ার গোসল যেভাবে করবেন:

  1. এক বালতি পানি নিন এবং তাতে দুই হাত ডুবিয়ে রাখুন।
  2. হাত ডুবানো অবস্থায় পড়ুন: যেকোনো দরূদ ৭ বার, সূরা আল-ফাতিহা: সর্বোত্তম দোয়া ৭ বার, আয়াতুল কুরসী ৭ বার, সূরা কাফিরূন, ইখলাস, ফালাক ও নাস প্রতিটি ৭ বার, শেষে আবার দরূদ ৭ বার।
  3. পড়া শেষে হাত তুলে নিন এবং এই পানি দিয়ে গোসল করুন।
  • সময় কম হলে ৭ বারের জায়গায় ৩ বার পড়ুন, অথবা শুরুর ৭ বার দরূদ বাদ দিন। হাত ডুবিয়ে বসে থাকা সম্ভব না হলে পড়ে বালতির পানিতে ফুঁ দিন। যত বেশি পড়বেন, তত বেশি উপকার।
  • টয়লেট আর গোসলখানা একসাথে হলে বালতি বাইরে এনে পড়ুন।
  • এই পানিতে গোসলের পর চাইলে সাধারণ পানিতে গোসল করতে পারেন, কিন্তু রুকইয়ার পানির সাথে অন্য পানি মেশালে প্রভাব কমে যায়।
  • রোগী নিজে পড়তে না পারলে অন্য কেউ পানিতে হাত রেখে পড়ে দেবেন, রোগী শুধু গোসল করবেন। পিরিয়ডের সময়ও অন্য কেউ পড়ে দিলে গোসল করতে সমস্যা নেই।
  • আবশ্যক নয়, তবে কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শোনার পর গোসলে যাওয়া উত্তম।

কতদিন: সমস্যার মাত্রা অনুযায়ী সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন লাগে। সমস্যা খুব বেশি হলে পরপর ২১ দিন করুন। সুস্থ হয়ে গেলে রুকইয়াহ শুনলে আর বিশেষ কিছু অনুভূত হয় না, সাধারণ তিলাওয়াতের মতো লাগে, আর লক্ষণগুলোও চলে যায়। এরপরও না সারলে আল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্স করে দেখতে পারেন। রুকইয়ার পানি, গোসল ও অন্যান্য উপকরণ নিয়ে বিস্তারিত: রুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদান।

সতর্কতা

  • বদনজর কাটাতে কবিরাজ, তাবিজ-কবচ, নজর-টিপ, কালো সুতা বা এ ধরনের কিছুর আশ্রয় নেবেন না। মাসনূন দোয়া ও রুকইয়াহই যথেষ্ট; হেফাযতকারী আল্লাহ।
  • যার নজর লেগেছে বলে সন্দেহ, তাকে দোষারোপ বা অপমান করবেন না; নজর সাধারণত অনিচ্ছায় লাগে। ওযুর পানি চাইতে হলে সুন্দরভাবে চাইবেন।
  • প্রতিটি সমস্যাকে নজর ভেবে আতঙ্কিত হবেন না, আবার রুকইয়াহকে ডাক্তারি চিকিৎসার বিকল্পও বানাবেন না। দুটো একসাথে চলুক।

জ্বর না কমা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, পানিশূন্যতা বা শিশুর খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান। রুকইয়াহ চিকিৎসার পাশাপাশি চলবে, তার জায়গায় নয়।

সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ৬৭–৮৯), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।

আরও পড়ুন

রুকইয়াহ কী?রুকইয়াহ শারইয়্যাহর অর্থ, জায়িয হওয়ার তিন শর্ত, রুকইয়ার তিন স্তর, জরুরি পরিভাষা এবং কেন প্রত্যেক পরিবারে কারো না কারো রুকইয়াহ জানা দরকার।লেখাসুন্নাহসম্মত রুকইয়াহর ১০টি পদ্ধতিশুধু তিলাওয়াত, হাত রেখে পড়া, ফুঁ, হালকা থুতু, হাত বুলানো, পানি-লবণ, মাটি ও টানা কয়েক দিন: হাদীসে আসা রুকইয়ার দশটি পদ্ধতি ও প্রয়োগের নিয়ম।লেখারুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদানরুকইয়ার আগে ঘর ও মন প্রস্তুত করা, রুকইয়ার পানি, যমযম, মধু, কালোজিরা, বরই পাতা, রুকইয়ার গোসলের নিয়ম এবং রুকইয়ার অডিও নিয়ে জরুরি প্রশ্নোত্তর।লেখানিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?সত্তর হাজারের হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা, কখন নিজে আর কখন অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ করাবেন, ভালো রাক্বীর বৈশিষ্ট্য এবং জাদুকর কবিরাজ চেনার লক্ষণ।লেখারুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝারুকইয়ার পর ক্লান্তি, ব্যথা বা বমি হলে কী করবেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন, সুস্থ হতে কেন দেরি হয় এবং কীভাবে বুঝবেন রুকইয়াহ সত্যিই শেষ।লেখাজিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসাজিনের আসর কেন ও কখন হয়, কীভাবে চিনবেন ও বাঁচবেন, আর কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতিতে কীভাবে রুকইয়াহ করবেন: শান্ত ও বিস্তারিত নির্দেশনা।লেখাবাড়িতে জিনের সমস্যা হলেবাড়িতে অস্বাভাবিক আওয়াজ, ছায়া বা জিনিস সরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে কী করবেন: কারণ, পাঁচটি শরীয়তসম্মত পদ্ধতি ও পরে যা মেনে চলবেন।লেখাজাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহজাদুর বাস্তবতা, ধরন ও লক্ষণ, জাদুকর কবিরাজ চেনার উপায়, তাবিজ ও জাদুর জিনিস নষ্টের নিয়ম এবং জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ ও প্রেসক্রিপশন।লেখাবিভিন্ন ধরনের জাদুর রুকইয়াহবিয়ে আটকানো, বিচ্ছেদ, বশ করা, পাগল বানানো, বান মারা, ইস্তিহাযা, সহবাসে অক্ষমতা ও গর্ভপাতের জাদু: প্রতিটির লক্ষণ ও দিনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন।লেখাওয়াসওয়াসা রোগ: মুক্তির উপায়ওযু-নামায নিয়ে সন্দেহ, ঈমান নিয়ে অবাঞ্ছিত চিন্তা বা কুমন্ত্রণা? পাত্তা না দেওয়ার কৌশল, মাসনূন দোয়া, রুকইয়াহ ও কখন ডাক্তার দেখাবেন।লেখাসাধারণ অসুস্থতায় রুকইয়াহব্যথা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা, চোখ, তোতলামি, শ্বাসকষ্ট, হাড়ক্ষয় ও ক্লান্তিতে ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত রুকইয়ার নিয়ম।লেখাশিশুদের রুকইয়াহশিশুর রুকইয়াহ সহজ: কোলে নিয়ে মাথায় হাত রেখে মাসনূন দোয়া ও তিন কুল। তাবিজ-টিপ ছাড়া সুরক্ষা, কখন বদনজর, আর যা কখনো করবেন না।লেখাআল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্সপানি, অলিভ অয়েল, মধু ও কালোজিরায় রুকইয়াহ পড়ে সাত দিনের পূর্ণ রুটিন: উপকরণ, প্রস্তুতি, রাত-সকালের নিয়ম ও সতর্কতা।লেখাসার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রামসমস্যা কয়েক রকম, বুঝতে পারছেন না কোন রুকইয়াহ লাগবে? প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ ও প্রতি মাসের একটি সাধারণ রুকইয়াহ রুটিন।লেখাজাদু ও জিন থেকে হেফাযতের মাসনূন আমলসকাল-সন্ধ্যা, ঘুমের আগে ও দিনের বিভিন্ন সময়ের সুন্নাহসম্মত আমল: কোনটা কখন, কতবার পড়বেন, জাদু, জিন ও বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য।লেখারুকইয়াহর আয়াতের তালিকাসাধারণ রুকইয়াহর ২০টি আয়াত, আয়াতে শিফা, আয়াতুল হারক, আর জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা ও অসুস্থতার জন্য আলাদা আয়াত: কীভাবে পড়বেন সহ।লেখা