বদনজর, জাদু বা জিনের কথা উঠলেই আমাদের সমাজে অনেকে কবিরাজ, তাবিজ আর পানিপড়ার দিকে ছোটেন। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে অসুস্থ হলে কুরআন ও দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছেন, সাহাবীদের তা শিখিয়েছেন, আর শিরকমিশ্রিত ঝাড়ফুঁক থেকে সাবধান করেছেন। এই সুন্নাহসম্মত চিকিৎসার নামই রুকইয়াহ শারইয়্যাহ।
এই লেখায় জানবেন রুকইয়াহ আসলে কী, কোনটা বৈধ আর কোনটা নয়, রুকইয়ায় কী কী পড়া হয়, এবং কেন প্রত্যেক মুসলিম পরিবারে অন্তত একজনের এটা জানা দরকার।
শব্দের অর্থ ও শরীয়তের পরিভাষা
আরবি ভাষায় “রুকইয়াহ” শব্দের পরিধি বেশ বড়। অভিধানে ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র, সম্মোহন, জাদু, তাবিজ-কবচ সবই রুকইয়াহ। সাধারণ ব্যবহারে এর মানে দাঁড়ায় বিশেষ কিছু পড়ে ফুঁ দেওয়া, যাতে কোনো প্রভাব দেখা যায়। অর্থাৎ শুধু আভিধানিক অর্থ ধরলে শরীয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক যেমন রুকইয়াহ, কুফরী জাদুর মন্ত্রও তেমনি রুকইয়াহ।
শরীয়তের পরিভাষায় অর্থটা সুনির্দিষ্ট: নিজের বা অন্যের সুস্থতা কিংবা অন্য কোনো বৈধ প্রয়োজনে, একমাত্র আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কুরআনের আয়াত, দোয়া অথবা আল্লাহর নাম ও গুণাবলি পাঠ করাকেই রুকইয়াহ বলে। একেই বলা হয় রুকইয়াহ শারইয়্যাহ, অর্থাৎ শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ। এই সাইটে “রুকইয়াহ” বলতে সবসময় এটাই বোঝানো হয়েছে।
রুকইয়াহ কিসের জন্য, কিসের জন্য নয়
শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক, সব ধরনের রোগে রুকইয়াহ করা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সেই রোগের ওষুধ থাকুক বা না থাকুক, রুকইয়াহ করতে কোনো বাধা নেই। বদনজর, জাদু, জিনের আসর ও ওয়াসওয়াসার মতো সমস্যায় তো বটেই, সাধারণ ব্যথা, জ্বর বা দীর্ঘ অসুখেও এটি সুন্নাহসম্মত চিকিৎসা।
তবে রুকইয়াহ মনের আশা পূরণের মন্ত্র নয়। নির্দিষ্ট কাউকে বিয়ে করা, দ্রুত বিয়ে হওয়া, পরীক্ষায় ভালো ফল বা ব্যবসায় উন্নতির “তদবীর” বা ওযীফা হিসেবে একে দেখা ভুল। এসব প্রয়োজনে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং চেষ্টা চালিয়ে যান। রুকইয়াহ মূলত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি।
রুকইয়াহ জায়িয হওয়ার তিন শর্ত
জাহিলি যুগের ঝাড়ফুঁক নিয়ে সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সেগুলো শুনতে চাইলেন এবং বললেন, যে রুকইয়ায় শিরক নেই তাতে কোনো সমস্যা নেই। (মুসলিম ২২০০) আরেক হাদীসে তিনি চিকিৎসা নিতে বলেছেন, কিন্তু হারাম কিছু দিয়ে চিকিৎসা করতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ ৩৮৭৪)
ইমাম নববী, ইবনু হাজার ও সুয়ূতী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, তিনটি শর্ত পূরণ হলে রুকইয়াহ জায়িয হওয়ার ব্যাপারে আলিমদের ঐকমত্য আছে:
- শিরক বা কুফরের মিশ্রণ থাকবে না। পড়া হবে কুরআন, সহীহ দোয়া এবং আল্লাহর নাম ও গুণাবলি দিয়ে।
- অর্থ বোধগম্য হবে। দুর্বোধ্য শব্দ, সংকেত, নকশা বা অজানা নামের মন্ত্র চলবে না।
- রুকইয়ার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা আছে, এমন বিশ্বাস রাখা যাবে না। আরোগ্য আসে শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে, রুকইয়াহ একটি মাধ্যম মাত্র।
রুকইয়াহ কীভাবে কাজ করে
রুকইয়াহ দুইভাবে কাজ করে। প্রথমত, ঝাড়ফুঁক হিসেবে: কুরআনের আয়াত ও মাসনূন দোয়ার শব্দগুলো আল্লাহর হুকুমে রোগ, বদনজর, জাদু ও শয়তানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, দোয়া হিসেবে: পড়ার সময় আপনি আসলে আল্লাহর কাছেই আরোগ্য চাইছেন। তাই রুকইয়ার সময় মন আল্লাহর দিকে ফেরানো এবং ঈমান-আমল ভালো করার চেষ্টা খুব জরুরি।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) যাদুল মাআদে এ বিষয়ে যা বলেছেন তার সারকথা হলো: দেহ ও মনের, দুনিয়া ও আখিরাতের সব রোগের পূর্ণ চিকিৎসা কুরআনে আছে। তবে এর সুফল পেতে সত্যিকারের আস্থা, দৃঢ় বিশ্বাস ও নিষ্ঠা নিয়ে, শর্তগুলো মেনে কুরআনকে রোগের ওপর প্রয়োগ করতে হয়।
তিন স্তরের রুকইয়াহ
রুকইয়ায় যা পড়া হয়, তা তিন স্তরে ভাগ করা যায়: সর্বোত্তম, উত্তম ও বৈধ। প্রতিটি স্তর থেকে ক্রমানুসারে পড়তেই হবে, এমন নয়। সব মিলিয়ে পড়তে পারেন, আবার যেকোনো এক ধরন থেকেও পড়তে পারেন। তবে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুধু মাসনূন রুকইয়াহগুলো বারবার ও দীর্ঘক্ষণ পড়লে উপকার তুলনামূলক বেশি হয়, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়। প্রচলিত “সাধারণ রুকইয়ার আয়াত” তালিকাটি প্রথম দুই স্তর থেকেই সাজানো।
১. সর্বোত্তম ও সুন্নাত রুকইয়াহ
- যা দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ, জিবরীল (আ.) বা সাহাবীরা রুকইয়াহ করেছেন: যেমন আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ, জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি আরকীক, সূরা ফাতিহা, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।
- শয়তান থেকে নিরাপত্তা, বিপদমুক্তি বা সুস্থতার জন্য যা তিনি নিজে পড়েছেন বা পড়তে বলেছেন: যেমন পুরো সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসী এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির।
- কুরআন বা সহীহ হাদীসে আসা অন্য নবীদের দোয়া: আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া, মূসা (আ.)-এর দোয়া মূসা (আ.)-এর দোয়া: রিযিক ও কল্যাণের প্রয়োজনে এবং ইবরাহীম (আ.)-এর আশ্রয় প্রার্থনা সন্তানদের হেফাযতের দোয়া।
২. উত্তম রুকইয়াহ
যেসব আয়াতের বিষয়বস্তু রোগীর সমস্যার সাথে মেলে। মাসনূন রুকইয়ার পর এগুলো অন্য আয়াতের চেয়ে বেশি উপকারী। যেমন:
- জাদুগ্রস্তের জন্য: আল-আ‘রাফ ৭:১১৭–১২২, ইউনুস ১০:৮১–৮২, ত্বহা ২০:৬৯
- জিন-আক্রান্তের জন্য: আল-বাকারা ২:১০২, আস-সাফফাত ৩৭:১–১০, আল-জিন ৭২:১–৯
- বদনজরে আক্রান্তের জন্য: ইউসুফ ১২:৬৭, আল-কাহফ ১৮:৩৯, আল-কলম ৬৮:৫১–৫২
- হাড়ক্ষয় রোগে: ইয়াসীন ৩৬:৭৮–৭৯, আল-কিয়ামাহ ৭৫:৩–৪
৩. বৈধ রুকইয়াহ
কুরআনের অন্য যেকোনো আয়াত, সহীহ সূত্রে বর্ণিত যেকোনো দোয়া, এমনকি নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়া, সবই এই স্তরে পড়ে। যেমন প্রচলিত দুটি দোয়া: সব জাদু নষ্ট করার দোয়া সব জাদু নষ্ট হওয়ার দোয়া: আল্লাহুম্মা আবত্বিল কুল্লা সিহর এবং আরোগ্য নাযিলের দোয়া আরোগ্য চাওয়ার দোয়া: আল্লাহুম্মা আনযিলিশ শিফা। এ দুটি হাদীসে বর্ণিত নয়, নিজের পক্ষ থেকে করা দোয়া হিসেবে পড়া হয়।
শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন না করলে তিন স্তরের সবই জায়িয এবং রুকইয়াহ শারইয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত।
জরুরি কিছু পরিভাষা
- সেলফ রুকইয়াহ: পেশাদার রাক্বীর সাহায্য ছাড়া নিজেই নিজের বা পরিবারের জন্য রুকইয়াহ করা।
- রাক্বী: যিনি অন্যের ওপর রুকইয়াহ করেন।
- আয়াতুল কুরসী: সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত।
- আয়াতুল হারক: জাহান্নাম, আযাব ও আল্লাহর গজবের কথা আছে এমন আয়াত।
- আয়াতুশ শিফা: যেসব আয়াতে আরোগ্যের কথা আছে। প্রসিদ্ধ ছয়টি: আত-তাওবা ৯:১৪, ইউনুস ১০:৫৭, আন-নাহল ১৬:৬৯, আল-ইসরা (বনী ইসরাঈল) ১৭:৮২, আশ-শু‘আরা ২৬:৮০, ফুসসিলাত (হা-মীম সাজদা) ৪১:৪৪।
- তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস। দেখুন তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস।
- চার কুল: তিন কুলের সাথে সূরা কাফিরূন: ঘুমের আগে।
- আট সূরা: ইয়াসীন, সাফফাত, দুখান, জিন, যিলযাল, ইখলাস, ফালাক ও নাস।
সব আয়াতের পূর্ণ তালিকা পাবেন রুকইয়াহর আয়াতের তালিকা পাতায়।
রুকইয়াহ শারইয়্যাহ কেন গুরুত্বপূর্ণ
বদনজর, জাদু ও জিনের সমস্যা যত ব্যাপক, এর সঠিক সমাধান সম্পর্কে অজ্ঞতা তার চেয়েও বেশি। ফলে মানুষ টাকা, সময় ও স্বাস্থ্য হারায়, সংসার ভাঙে, আর কবিরাজের শিরকি কাজে জড়িয়ে আখিরাতও ঝুঁকিতে ফেলে। রুকইয়াহ শারইয়্যাহ চর্চার লক্ষ্য তাই কয়েকটি:
- আল্লাহর কালামকে চিকিৎসার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
- সমাজ থেকে কুফরী জাদুর ফিতনা দূর করা।
- “কবিরাজ” নামধারী জাদুকরদের থেকে মানুষকে দূরে রাখা।
- প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটি সুন্নাহ আবার জীবিত করা।
আর এসবের পেছনে মূল উদ্দেশ্য একটাই: আল্লাহর সন্তুষ্টি।
কেন নিজে রুকইয়াহ জানা দরকার
ডায়রিয়া হলে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হয়, এটা এখন প্রায় সবাই জানে বলে অনেক বিপদ শুরুতেই থেমে যায়। রুকইয়াও তেমন। সন্তানের নজর লাগলে, পরিবারের কারো ওপর জাদুর লক্ষণ দেখলে বা হঠাৎ কোথাও ব্যথা হলে কী করতে হবে তা জানা থাকলে সমস্যা বেশিদূর গড়ায় না। দাম্পত্য কলহ তালাক পর্যন্ত যায় না, শিশুকেও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়াতে হয় না। সেলফ রুকইয়াহ তাই এক ধরনের ফার্স্ট এইড।
কুরআনে উপকার ছাড়া ক্ষতির কিছু নেই। এটি শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রেখে যাওয়া জীবন্ত মুজিযা। শুরু করতে বড় কোনো যোগ্যতা লাগে না:
- পুরো কুরআন মুখস্থ থাকা লাগবে না, দেখে দেখে পড়তে পারেন।
- শুধু সূরা ফাতিহা, ইখলাস, ফালাক ও নাস দিয়েও রুকইয়াহ করা যায়।
- বিখ্যাত কারীর মতো সুর লাগবে না। যতটা সম্ভব শুদ্ধ করে পড়ুন, আর ভুল থাকলে ধীরে ধীরে শিখে নিন।
সমস্যা দেখা দিলে এই ক্রম মেনে চলুন:
- নির্ভরযোগ্য নিয়ম দেখে প্রথমে নিজেই রুকইয়াহ করুন।
- প্রয়োজন হলে আপনার চেয়ে বেশি জানেন এমন কারো পরামর্শ নিন।
- তাতেও কাজ না হলে অভিজ্ঞ, সুন্নাহ মেনে চলা কোনো রাক্বীর সাহায্য নিন।
বিস্তারিত পড়ুন: নিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?
ডাক্তারি চিকিৎসা বাদ দেবেন না। অনেকে মনে করেন রুকইয়াহ করলে ডাক্তারের চিকিৎসা নেওয়া যাবে না। এটা ভুল ধারণা। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও রুকইয়াহ দুটোই নেওয়া সুন্নাত। শারীরিক বা মানসিক যেকোনো উপসর্গে ডাক্তার দেখান, চলমান ওষুধ কখনো নিজে থেকে বন্ধ করবেন না, আর পাশাপাশি রুকইয়াহ চালিয়ে যান। প্রতিটি সমস্যাকে জিন বা জাদু ভাবারও কারণ নেই।
কবিরাজ, তান্ত্রিক ও তাবিজ-কবচ থেকে দূরে থাকুন। “কুফরী জাদু কাটাতে কুফরীই লাগে” কথাটি ভুল ও বিপজ্জনক। জাদু দিয়ে জাদু কাটানো (নুশরা), জিনের সাহায্য নেওয়া, সংখ্যা বা নকশার তদবীর, কিংবা অদৃশ্যের খবর জানার দাবি, এসবই শিরক ও কুফরের দরজা খুলে দেয়। সঠিক রুকইয়াহ শুধু কুরআন, সহীহ দোয়া আর বৈধ উপায়ে হয়।
এরপর কী পড়বেন
- সুন্নাহসম্মত রুকইয়াহর ১০টি পদ্ধতি
- রুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদান
- রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ১৪–১৮, ৩৭–৪২, ৪৬–৪৮, ৫৭–৬১), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।