দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীরাই আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ। রুকইয়ার ক্ষেত্রেও তাঁরা কী পড়েছেন এবং কীভাবে পড়েছেন, তা সহীহ হাদীসে সংরক্ষিত আছে। এই লেখায় সেই পদ্ধতিগুলো দশ ভাগে সাজানো হয়েছে। প্রতিটির সাথে হাদীসের সারকথা আর ঘরে কীভাবে প্রয়োগ করবেন তা দেওয়া হলো।
শুরুতেই একটি সতর্কতা: নিচের যেসব পদ্ধতিতে রোগীকে স্পর্শ করতে হয় (হাত রাখা, হাত বুলানো, থুতু লাগানো), সেগুলো গাইর মাহরামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। রাক্বী কোনো অবস্থায় গাইর মাহরাম নারী বা পুরুষকে স্পর্শ করবেন না। তাদের জন্য শুধু তিলাওয়াত, কিংবা তিলাওয়াত করে ফুঁ দেওয়ার মতো স্পর্শহীন পদ্ধতি বেছে নিন।
১. শুধু তিলাওয়াত বা দোয়া (ফুঁ বা স্পর্শ ছাড়া)
রাসূলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ হলে জিবরীল (আ.) এসে আল্লাহর নামে তাঁর ওপর রুকইয়াহ করেন। সেই দোয়াটি হলো জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি আরকীক। (মুসলিম ২১৮৬)
আরেকবার সাবিত আল-বুনানী (রহ.) অসুস্থতার কথা জানালে আনাস (রা.) বললেন, তোমাকে কি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রুকইয়াহ দিয়ে রুকইয়াহ করব? তারপর তিনি পড়লেন নবীজির রুকইয়াহ (আনাস রা.-এর বর্ণনা): আল্লাহুম্মা রব্বান নাস, মুযহিবাল বা’স। (বুখারী ৫৭৪২)
প্রয়োগ: রোগীর কাছে বসে মনোযোগ দিয়ে দোয়া বা আয়াত পড়ুন। এটি সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি, আর গাইর মাহরামের ক্ষেত্রেও নিরাপদ।
২. ব্যথার জায়গায় বা মাথায় হাত রেখে পড়া
উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর থেকে শরীরে একটা ব্যথা অনুভব করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ব্যথার জায়গায় হাত রেখে পড়ার একটি দোয়া শিখিয়ে দেন। তিনি সেভাবে আমল করলেন, ব্যথা চলে গেল, আর এরপর থেকে পরিবারের লোকদেরও এটা করতে বলতেন। (মুসলিম ২২০২)
- শরীরের যেখানে ব্যথা, সেখানে নিজের হাত রাখুন।
- ৩ বার বলুন “বিসমিল্লাহ”।
- তারপর ৭ বার পড়ুন “আঊযু বি‘ইযযাতিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহী মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযির”। পূর্ণ দোয়া: শরীরে ব্যথা হলে।
অন্যের জন্য করলে (শুধু মাহরাম হলে) তার মাথায় বা আক্রান্ত অঙ্গে হাত রেখে পড়া যায়।
৩. পড়ার পর ফুঁ দেওয়া
খায়বারের যুদ্ধে সালামা ইবনুল আকওয়া (রা.)-এর পায়ের গোছায় আঘাত লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই ক্ষতে তিনবার ফুঁ দেন। সালামা (রা.) বলতেন, এরপর সেখানে আর কখনো ব্যথা অনুভব করেননি। (বুখারী ৪২০৬)
প্রয়োগ: দোয়া বা আয়াত পড়া শেষ করে আক্রান্ত জায়গায় ফুঁ দিন। চাইলে ৩ বার ফুঁ দিন।
৪. পড়ার পর থুতু দেওয়া বা থুতু লাগানো
একদল সাহাবী সফরে এক গোত্রের কাছে আশ্রয় চাইলে তারা মেহমানদারি করতে রাজি হয়নি। পরে সেই গোত্রের সর্দারকে সাপে কাটে, কোনো চিকিৎসায় কাজ হচ্ছিল না। তখন এক সাহাবী সূরা ফাতিহা পড়ে পড়ে তার ওপর হালকা থুতু দিতে থাকেন, আর লোকটি এমনভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে যেন বাঁধন খুলে গেছে। বিনিময়ে তারা একপাল বকরি দেয়। ফিরে এসে ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি কীভাবে জানলে এটা রুকইয়াহ? তোমরা ঠিক করেছ; ভাগ করে নাও, আমার জন্যও এক ভাগ রেখো। (বুখারী ২২৭৬, মুসলিম ২২০১)
নামাযে শয়তানের ওয়াসওয়াসা এলে বাঁ দিকে তিনবার হালকা থুতু ফেলার নির্দেশও হাদীসে আছে। (মুসলিম ২২০৩)
প্রয়োগ: সূরা ফাতিহা বা অন্য রুকইয়াহ পড়ে আক্রান্ত জায়গায় হালকা থুতুসহ ফুঁ দিন, অথবা হাতে নিয়ে জায়গাটিতে লাগিয়ে দিন।
৫. কয়েকটি পদ্ধতি একসাথে করা
সাপে কাটার ঘটনাটি বিভিন্ন সূত্রে এসেছে। কোনো বর্ণনায় ফুঁ দেওয়ার কথা, কোনোটায় থুতু দেওয়ার কথা, কোনোটায় থুতু নিয়ে জায়গাটিতে লাগিয়ে বারবার হাত বুলানোর কথা আছে। একটি বর্ণনায় আছে, সাহাবী সূরা ফাতিহা ৭ বার পড়েছিলেন। সব মিলিয়ে বোঝা যায়, সাহাবীরা একাধিক পদ্ধতি একসাথে প্রয়োগ করেছেন। তাই কার্যকারিতা বাড়াতে আমরাও কয়েকটি পদ্ধতি মেলাতে পারি।
আলিমরা ফুঁ আর থুতুর মধ্যে সমন্বয় করেছেন এভাবে: এমনভাবে ফুঁ দেওয়া যাতে সাথে সামান্য থুতুও বের হয়। শুধু ফুঁয়ের চেয়ে এটা বেশি উপকারী।
থুতু দেওয়া মানে একদলা থুতু ফেলা নয়। জিহ্বা একটু ভিজিয়ে নিয়ে কিছুটা জোরে ফুঁ দিন, তাতে স্প্রের মতো খুব সামান্য থুতু বের হবে। এটুকুই যথেষ্ট।
৬. হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে হাত বুলানো
রাসূলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ হলে মুআওয়িযাত (সূরা ফালাক ও নাস) পড়ে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন। শেষ অসুস্থতায় ব্যথা যখন বেড়ে গেল, আয়িশা (রা.) সূরাগুলো পড়ে তাঁর হাতেই ফুঁ দিতেন এবং বরকতের আশায় সেই হাত তাঁর শরীরে বুলিয়ে দিতেন। (বুখারী ৫০১৬, মুসলিম ২১৯২) ইমাম যুহরী (রহ.)-কে পদ্ধতিটি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, দুই হাতে ফুঁ দিয়ে তা দিয়ে চেহারা মাসেহ করতেন। (বুখারী ৫৭৩৫)
- দুই হাত একসাথে করে সূরা ফালাক ও নাস পড়ুন (চাইলে সাথে সূরা ইখলাসও, দেখুন তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস)।
- হাতের তালুতে ফুঁ দিন।
- সেই হাত ব্যথার জায়গায়, চেহারায় বা যতটা সম্ভব সারা শরীরে বুলিয়ে দিন।
৭. ফুঁ ছাড়া ডান হাত বুলিয়ে দোয়া পড়া
পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তার শরীরে ডান হাত বুলিয়ে দিতেন আর পড়তেন আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ। (বুখারী ৫৭৪৩, মুসলিম ২১৯১)
প্রয়োগ: মাহরাম রোগীর গায়ে ডান হাত বুলাতে বুলাতে দোয়াটি পড়ুন। এখানে ফুঁ দেওয়া জরুরি নয়।
৮. পানি, লবণ বা ওষুধে রুকইয়াহ করে ব্যবহার করা
আলী (রা.) বর্ণনা করেন, নামাযরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে একটি বিচ্ছু কামড় দেয়। নামায শেষে তিনি পানি ও লবণ আনালেন, সূরা কাফিরূন, ফালাক ও নাস পড়তে পড়তে কামড়ের জায়গায় লবণ-পানি মালিশ করতে লাগলেন। (তাবারানী, আল-মু‘জামুল আওসাত) কোনো বর্ণনায় শুধু ফালাক ও নাসের কথা আছে, কোনোটায় আছে পানিতে লবণ গুলে জায়গাটিতে ঢেলে চার কুল পড়ার কথা।
- একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে লবণ গুলে নিন।
- সূরা কাফিরূন: ঘুমের আগে, সূরা ফালাক ও নাস পড়ুন (চাইলে ইখলাসসহ চার কুল)।
- পড়তে পড়তে লবণ-পানি দংশনের জায়গায় মালিশ করুন বা ঢেলে দিন।
সাবিত ইবনু কাইস (রা.) অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে দেখতে গিয়ে পড়লেন অসুস্থতায় প্রচলিত দোয়া: ইকশিফিল বা’সা রব্বান নাস। তারপর বাত্বহান (মদীনার একটি উপত্যকা) থেকে কিছু মাটি একটি পাত্রে নিয়ে পানি দিলেন, তাতে ফুঁ দিলেন, এবং সেই পানি তাঁর গায়ে ঢেলে দেওয়া হলো। (আবু দাউদ ৩৮৮৫) একদল মুহাদ্দিস এর সনদকে দুর্বল বলেছেন, তবে ইবনু হাজার (রহ.) সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারীকে গ্রহণযোগ্য (মাকবুল) বলেছেন এবং অন্য হাদীসও এর সমর্থন করে। শাইখ ইবনু বায (রহ.) রুকইয়ার পানি দিয়ে গোসল ও পান করার দলিল হিসেবে এই হাদীস উল্লেখ করেছেন।
এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মেলে: ওষুধ ও রুকইয়াহ একসাথে করা যায়, আবার দুটো আলাদাভাবেও সুন্নাহ। রুকইয়ার পানি তৈরি ও ব্যবহারের বিস্তারিত নিয়ম আছে রুকইয়াহর প্রস্তুতি ও সহায়ক উপাদান লেখায়।
৯. আঙুলে মাটি লাগিয়ে দোয়া পড়া
কারো অসুখ, ফোঁড়া বা জখম হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ আঙুল দিয়ে এভাবে ইশারা করে পড়তেন ক্ষত বা ব্যথায় রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি তুরবাতু আরদিনা। (বুখারী ৫৭৪৫, মুসলিম ২১৯৪) হাদীসের বর্ণনাকারী সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা (রহ.) দেখানোর জন্য শাহাদাত আঙুল মাটিতে লাগিয়ে তুলে নিতেন।
- শাহাদাত আঙুলে নিজের সামান্য থুতু লাগিয়ে আঙুলটি পরিষ্কার মাটিতে ছুঁইয়ে তুলে নিন।
- দোয়াটি পড়ুন।
- আঙুলটি ক্ষত বা ব্যথার জায়গায় লাগিয়ে দিন।
খোলা বা গভীর ক্ষতে মাটি লাগালে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এমন ক্ষেত্রে ক্ষতের পাশে লাগান অথবা শুধু দোয়া পড়ে ফুঁ দিন, আর ক্ষতের চিকিৎসা ডাক্তারের পরামর্শে করুন।
১০. টানা কয়েক দিন রুকইয়াহ করা
খারিজাহ ইবনুস সালত (রহ.)-এর চাচা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে ফেরার পথে এক গোত্রে পৌঁছান। সেখানে শিকলে বাঁধা এক মানসিক ভারসাম্যহীন লোক ছিল। তিনি তিন দিন সকাল-সন্ধ্যা তার ওপর সূরা ফাতিহা পড়েন, আর প্রতিবার শেষে মুখে থুতু জমিয়ে হালকা ছিটিয়ে দেন। লোকটি সুস্থ হয়ে ওঠে। পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানালেন, মানুষ তো বাতিল ঝাড়ফুঁক দিয়ে উপার্জন করে, আর তুমি উপার্জন করেছ সঠিক রুকইয়াহ দিয়ে; তুমি তা খেতে পারো। (আবু দাউদ ৩৪২০)
প্রয়োগ: পুরোনো বা কঠিন সমস্যায় এক বেলার রুকইয়াহ যথেষ্ট না-ও হতে পারে। কয়েক দিন সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিত রুকইয়াহ করুন, যেমন প্রতিবেলা সূরা ফাতিহা পড়ে শেষে হালকা থুতুসহ ফুঁ দিন।
ঘরে প্রয়োগের একটি সহজ উদাহরণ
ওপরের পদ্ধতিগুলো মিলিয়ে নিজের বা মাহরাম কারো সাধারণ অসুস্থতায় এভাবে করতে পারেন:
- ওযু করে নিন এবং কোন সমস্যার জন্য রুকইয়াহ করছেন তা মনে মনে নির্দিষ্ট করুন।
- সূরা ফাতিহা পড়ুন (একটি বর্ণনা অনুযায়ী ৭ বার)।
- সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ুন, সাথে আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ দোয়াটি।
- হাতে হালকা থুতুসহ ফুঁ দিয়ে ব্যথার জায়গায় বা সারা শরীরে বুলিয়ে দিন।
- সমস্যা পুরোনো হলে কয়েক দিন সকাল-সন্ধ্যা এভাবে চালিয়ে যান।
সংখ্যা ও পদ্ধতি নিয়ে আরও জানতে পড়ুন রুকইয়াহ কী? এবং রুকইয়াহর আয়াতের তালিকা।
সুন্নাহর বাইরে যাবেন না। ওপরের সব পদ্ধতিতে পড়া হয় কুরআন ও সহীহ দোয়া, আর আরোগ্য চাওয়া হয় শুধু আল্লাহর কাছে। তাবিজ ঝোলানো, দুর্বোধ্য মন্ত্র, নকশা আঁকা, জিন হাজির করা বা কবিরাজের “পড়া” জিনিস এসবের অংশ নয়। আর রুকইয়াহ ওষুধের বিকল্প নয়; ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি করুন।
হাদীস থেকে এটাও বোঝা যায়, সঠিক রুকইয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়িয। তবে রুকইয়াহকে ব্যবসা বানানো বা টাকার লোভ করা একজন রাক্বীর জন্য শোভন নয়। দেখুন নিজে রুকইয়াহ, নাকি রাক্বীর কাছে?
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ১৭–২৫), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।