কেউ আগে আক্রান্ত হয়ে থাকুন বা না থাকুন, জাদু ও জিন-শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো আমলগুলো আমাদের সবারই যত্নের সাথে করা উচিত। এগুলোকে মাসনূন আমল, অর্থাৎ সুন্নাহ থেকে নেওয়া আমল বলা হয়। এর সুরক্ষার পাশাপাশি আরও লাভ আছে: আল্লাহর ওপর ভরসার অভ্যাস গড়ে ওঠে, সুন্নাহ মানার সওয়াব পাওয়া যায়, আর প্রতিদিন নিয়মিত কিছু নেকি আমলনামায় জমা হয়।
সারা দিনের, বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার, ফযীলতপূর্ণ দোয়া-যিকির আরও অনেক আছে। এখানে শুধু ক্ষতি থেকে হেফাযতের আমলগুলো একসাথে দেওয়া হলো; আল্লাহ চাইলে এগুলোই যথেষ্ট। অন্যান্য মাসনূন আমলের জন্য নির্ভরযোগ্য বই দেখতে পারেন, যেমন হিসনে হাসীন, হিসনুল মুসলিম, সিলাহুল মুমিন, আযকারে মাসনূনাহ ইত্যাদি।
শুরুর আগে কয়েকটি মূলনীতি
- আল্লাহর ওপর খাঁটি ভরসা। এটা মাসনূন যিকিরের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা ঈমান আনে এবং ঈমানের সাথে শিরক মেশায় না, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য (আল-আন‘আম ৬:৮২)। তাবিজ-কবচ, নজর-টিপ বা কবিরাজের দেওয়া জিনিসে ভরসা এই তাওয়াক্কুলের বিপরীত।
- অদ্ভুত ও বানানো ওযীফা থেকে দূরে থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এত দোয়া-যিকির এসেছে যে প্রতিদিন সব শেষ করাই কঠিন, আর এগুলোর ফযীলতও অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি। তাই আজগুবি বড় বড় ওযীফার কোনো প্রয়োজন নেই।
- সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের আমল যেন বাদ না পড়ে। পিরিয়ডের সময়ও এগুলো ছাড়বেন না; লেখকের মতে, তখন কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া অন্য দোয়া পড়তে সমস্যা নেই। কুরআনের আয়াতযুক্ত আমলগুলো আগে থেকে ফোনে রেকর্ড করে রেখে ওই সময়ে মনোযোগ দিয়ে শোনা যায়; শাইখ ওয়াহিদ আব্দুস সালাম বালী এমন পরামর্শ দিয়েছেন।
- ভুলে বাদ পড়লে মনে পড়ামাত্র আদায় করুন, এক ঘণ্টা পরে মনে পড়ুক বা মাঝরাতে।
যে ব্যক্তি দয়াময়ের যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য একজন শয়তানকে সঙ্গী করে দেওয়া হয় (আয-যুখরুফ ৪৩:৩৬)। তাই শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচতে প্রতিদিনের যিকিরে যত্নবান হওয়া খুব জরুরি।
নিজে আমল করলে যত বেশি পারেন করুন। কিন্তু জিন বা জাদুর রোগীর ওপর একসাথে অনেক আমল চাপিয়ে দেবেন না। অল্প কিছু দিন, যেমন শুধু তিন কুল আর আয়াতুল কুরসী, তবে তা যেন নিয়মিত ও সবসময় হয়।
সকাল-সন্ধ্যার আমল
নিচের প্রতিটি সকালে একবার এবং সন্ধ্যায় একবার (উল্লেখিত সংখ্যায়) পড়ুন।
- ৩ বার: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাত। বিষ, জাদু ও বিষাক্ত প্রাণীসহ সব সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয়। (মুসলিম)
- ৩ বার: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু। উসমান ইবনু আফফান (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, যে সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার এটি পড়বে, কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (তিরমিযী ৩৩৮৮)
- প্রতিটি ৩ বার: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস। তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস। আব্দুল্লাহ ইবনু খুবাইব (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, সকাল-সন্ধ্যায় এই তিন সূরা তিনবার করে পড়লে তা সবকিছু থেকে হেফাযতের জন্য যথেষ্ট হবে। (তিরমিযী ৩৫৭৫)
- ৭ বার: হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া (৭ বার)। এটি আত-তাওবা ৯:১২৯ আয়াতের অংশ। যে এটি সাতবার পড়বে, আল্লাহ তার প্রয়োজনে যথেষ্ট হয়ে যাবেন। (আবু দাউদ ৫০৮১)
- দিনে ১০০ বার; কোনো দিন না পারলে অন্তত সকালে ১০ বার ও সন্ধ্যায় ১০ বার: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু। দিনে ১০০ বার পড়লে দশজন দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব, ১০০ নেকি লেখা, ১০০ গুনাহ মাফ, আর সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে হেফাযত; এর চেয়ে বেশি যে পড়ে সে ছাড়া কেউ তার চেয়ে উত্তম আমল নিয়ে আসবে না (বুখারী, মুসলিম)। আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)-এর বর্ণনায় সকালে ১০ বার পড়ার জন্যও ১০০ নেকি, ১০০ গুনাহ মোচন, একজন দাস মুক্তির সওয়াব ও সন্ধ্যা পর্যন্ত হেফাযতের কথা আছে, আর সন্ধ্যায় পড়লেও একই প্রতিদান (মুসনাদে আহমাদ)।
দুই রকম বর্ণনাই আছে, তবে ১০০ বারের ফযীলত বেশি, তাই ১০০ বার পড়ার চেষ্টা করুন। সারা দিনে ভাগ করে বা একসাথে, দুইভাবেই পড়া যায়। ইমাম নববী (রহ.)-সহ অনেকের মত হলো, সকালেই ১০০ বার পড়ে ফেলা উচিত, যেন সারা দিন ঢাল হয়ে থাকে (শরহুন নববী আলা মুসলিম)। জিন বা জাদুতে আক্রান্ত হলে ফজর বা মাগরিবের পর ১০০ বার করে পড়তে বলা হয়।
ঘুমানোর সময়ের আমল
- ওযু করে, ডান কাতে শোয়া। ওযু অবস্থায় ঘুমালে ফেরেশতারা তার হেফাযতের জন্য দোয়া করতে থাকেন (আল-মু‘জামুল আওসাত; বইয়ের ভাষ্যমতে সনদ জায়্যিদ)। এমনিতেও সবসময় ওযু অবস্থায় থাকা সুন্নাহ।
- বিছানা ঝেড়ে নেওয়া ও শোয়ার দোয়া। শোয়ার আগে চাদর, লুঙ্গি বা আঁচলের প্রান্ত দিয়ে তিনবার বিছানা ঝেড়ে নিন এবং বিসমিল্লাহ বলুন, কারণ আপনি জানেন না আপনার অনুপস্থিতিতে বিছানায় কী এসেছে। তারপর শুয়ে পড়ুন: ঘুমানোর দোয়া: বিসমিকা রব্বী ওয়াদা‘তু জাম্বী (আবু দাউদ ৫০৫০)। লেখকের অভিজ্ঞতা, দ্রুত ঘুমাতে চাইলে এই দোয়া পড়লে সহজে ঘুম আসে।
- আয়াতুল কুরসী। আয়াতুল কুরসী। ঘুমের আগে পড়লে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকেন, আর সকাল পর্যন্ত শয়তান কাছে আসতে পারে না। (বুখারী)
- সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আল-বাকারা ২:২৮৫–২৮৬)। রাতে যে এ দুটি পড়বে, তার জন্য তা যথেষ্ট হবে। (বুখারী)
- তিন কুল পড়ে শরীরে হাত বোলানো, ৩ বার। দুই হাত একসাথে করে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ুন, হাতের তালুতে ফুঁ দিন, তারপর মাথা ও চেহারা থেকে শুরু করে যতদূর হাত যায় পুরো শরীরে বুলিয়ে নিন। এভাবে তিনবার। আয়িশা (রা.) জানিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে এমন করতেন। (তিরমিযী ৩৪০২, বুখারী) তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস
- ঐচ্ছিক: আল্লাহুম্মা রাব্বাস সামাওয়াত: ঋণমুক্তি ও সব অনিষ্ট থেকে রক্ষা (মুসলিম ২৭১৩)
আরও হেফাযত চাইলে
ওপরের যিকিরগুলোর পরও কেউ বাড়তি সুরক্ষা চাইলে সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো পড়তে পারেন:
- সূরা বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াত: আল-বাকারা ২:১–৫
- আয়াতুল কুরসী ও তার পরের আয়াত: আল-বাকারা ২:২৫৫–২৫৬
- সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত: আল-বাকারা ২:২৮৪–২৮৬
- রুকইয়াহর দোয়ার তালিকার প্রথম দুটি, প্রতিটি ৩ বার: সন্তানদের হেফাযতের দোয়া এবং ঘুমের মধ্যে ভয় পেলে বা অস্থির লাগলে
- একই তালিকার ১৩ থেকে ১৭ নম্বর দোয়া, প্রতিটি ১ বার: শয়তানদের চক্রান্ত থেকে আশ্রয়, দুনিয়া ও আখিরাতে আফিয়াত চাওয়া, আল্লাহুম্মা আফিনী ফী বাদানী, শোয়ার সময়ের প্রচলিত দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিওয়াজহিকাল কারীম, আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী … মা শাআল্লাহু কানা (প্রচলিত সকালের দোয়া)
পুরো দোয়ার তালিকা দেখুন রুকইয়াহর আয়াতের তালিকা পাতার শেষে।
দিনের অন্যান্য সময়ের আমল
- সকালে ৭টি আজওয়া খেজুর। সম্ভব হলে মদীনার আজওয়া, না পেলে যেকোনো আজওয়া খেজুর। যে সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খায়, সেদিন কোনো বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করতে পারে না। (বুখারী)
- টয়লেটে ঢোকার আগে: টয়লেটে প্রবেশের দোয়া। খারাপ পুরুষ ও নারী জিন থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া। (তিরমিযী ৫)
- বিয়ের পর প্রথম স্ত্রীর কাছে গেলে: নতুন কিছু পেলে বা কিনলে (বাহন, পশু, স্ত্রী)। তার মধ্যকার কল্যাণ চাওয়া ও অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাওয়া; বর্ণনাকারী আরও বলেছেন, এরপর স্ত্রীর কপালের চুল ধরে তার জন্য বরকতের দোয়া করবে। (আবু দাউদ ২১৬০)
- স্ত্রী-সহবাসের আগে: স্বামী-স্ত্রী মিলনের আগে। এরপর ওই মিলনে সন্তান হলে শয়তান কখনো তার ক্ষতি করতে পারবে না। (বুখারী, আবু দাউদ ২১৬১)
- মসজিদে ঢোকার সময়: মসজিদে প্রবেশের সময় শয়তান থেকে আশ্রয়: আউযু বিল্লাহিল আযীম। কেউ এটা পড়লে শয়তান বলে, এই লোক আজ সারা দিনের জন্য আমার থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। (আবু দাউদ)
- নতুন কোনো জায়গা বা বাড়িতে গেলে, কিংবা গা ছমছমে জায়গা দিয়ে হাঁটলে: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাত। যে কোনো জায়গায় নেমে এটি বলবে, সেখান থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু তার ক্ষতি করবে না। (মুসলিম)
- বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়: ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া। তাকে বলা হয়: তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তুমি অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেয়েছ; আর শয়তান তার থেকে সরে যায়। (তিরমিযী)
দৈনন্দিন জীবনে আরও কিছু সতর্কতা
জিন ও বদনজরের অধ্যায়ে বইটি আরও কিছু প্রতিরোধমূলক অভ্যাসের কথা বলেছে, যা ওপরের আমলগুলোর সাথে মিলিয়ে নিলে সুরক্ষা আরও পূর্ণ হয়:
- জামাআতে নামায আদায় করা; গান-বাজনা, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ও পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে থাকা।
- পবিত্র থাকা; ঘরে ঢোকা-বের হওয়া, খাওয়া, অন্ধকার জায়গায় যাওয়া বা ওপর থেকে কিছু নিচে ফেলার মতো কাজে বিসমিল্লাহ বলা। ঘরে ঢোকার সময় ঘরে প্রবেশের সময় পড়া, অন্তত বিসমিল্লাহ বলা।
- মাগরিবের সময় বিসমিল্লাহ বলে দরজা-জানালা বন্ধ করা এবং শিশুদের ঘরে রাখা; রাতে ঘুমানোর সময় দরজা বন্ধ রাখা, পাত্র ঢেকে রাখা (বুখারী)।
- গর্তে প্রস্রাব না করা; অকারণে কুকুর, বিড়াল বা সাপ না মারা (মারতে হলে আগে তিনবার পর্যন্ত তাড়িয়ে দেওয়া)।
- কথার মাঝে আল্লাহর যিকির করা; পছন্দের কিছু দেখলে বরকতের দোয়া করা, যেমন পছন্দের কিছু দেখলে (বদনজর থেকে বাঁচাতে); নিজের নিয়ামতের কথা বললে “মা-শা-আল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ” যোগ করা।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় সন্তান, সম্পদ বা সুখের অহেতুক প্রদর্শন না করা; প্রয়োজন পূরণে গোপনীয়তা রাখা; বেশি বেশি সালামের প্রচলন করা, কারণ এতে হিংসা কমে।
- নারীদের শরীয়তসম্মত পর্দা রক্ষা করা।
বিস্তারিত দেখুন বদনজর: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা এবং জিনের সমস্যা: লক্ষণ ও চিকিৎসা।
শিশুদের সুরক্ষা
শিশুরা নিজে পড়তে না পারলে মা-বাবা বা অন্য কেউ পড়ে তাদের গায়ে ফুঁ দেবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য সন্তানদের হেফাযতের দোয়া পড়ে আশ্রয় চাইতেন (বুখারী)। মাঝে মাঝে সূরা ফালাক ও নাস পড়ে শিশুর গায়ে ফুঁ দিন। একজনের জন্য পড়লে “উ‘ঈযুকা”, দুজনের জন্য “উ‘ঈযুকুমা”, বহুজনের জন্য “উ‘ঈযুকুম” বলা ভালো; নিজের জন্য “আ‘ঊযু” বলবেন। বদনজর থেকে বাঁচাতে শিশুর গায়ে তাবিজ, কালো সুতা বা নজর-টিপের কোনো দরকার নেই; আল্লাহই হেফাযতকারী। আরও দেখুন শিশুদের রুকইয়াহ।
এই আমলগুলো সুরক্ষার মাধ্যম, কোনো জাদুমন্ত্র নয়। আরোগ্য ও হেফাযত দেন একমাত্র আল্লাহ। কোনো সমস্যা দেখা দিলেই তা জাদু বা জিন বলে ধরে নেবেন না; শারীরিক বা মানসিক উপসর্গ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, আর রুকইয়াহ চিকিৎসার পাশাপাশি চালিয়ে যান।
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ২০৩–২১১; সাথে ৭৭–৭৯, ১০৬–১০৮, ২৬৮–২৭০), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।