“আশফিয়া” শব্দটি “শিফা” (আরোগ্য) শব্দের বহুবচন। কুরআন ও হাদীসে যেসব জিনিসকে আরোগ্য বা বরকতের উৎস বলা হয়েছে, যেমন যমযম ও বৃষ্টির পানি, যাইতুনের তেল, মধু, কালোজিরা, আর সবার ওপরে কুরআনের তিলাওয়াত, এই প্রোগ্রামে সেগুলো একসাথে ব্যবহার করা হয়। তাই এর নাম আল-আশফিয়া, অর্থাৎ আরোগ্যের সমষ্টি।
রুটিনটি শাইখ আদিল বিন তাহির মুকবিল (হাফিযাহুল্লাহ)-এর দেওয়া। জাদু, জিন ও বদনজরের পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতাতেও এটি উপকারী। কারও একসাথে কয়েক রকম সমস্যা থাকলে, কিংবা একটি সমস্যাই খুব তীব্র হলে, শুরুতে এই ডিটক্স করে সমস্যাকে সহনীয় পর্যায়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি সার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রাম-এরও একটি অংশ।
রুকইয়াহ ডাক্তারি চিকিৎসার বিকল্প নয়, পাশাপাশি চলবে। চলমান কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না। ডায়াবেটিস, অ্যালার্জি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে মধু ও কালোজিরার পরিমাণ নিয়ে আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
যা যা লাগবে
- পানি, সাড়ে তিন থেকে চার লিটার। যমযমের পানি হলে সবচেয়ে ভালো; রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এতে শিফা আছে (আল-মু‘জামুল আওসাত)। না পেলে বৃষ্টির পানি, যাকে আল্লাহ বরকতময় বলেছেন (ক্বাফ ৫০:৯)। তাও না পেলে সাধারণ পানিই চলবে; রাসূলুল্লাহ ﷺ সাধারণ পানিও চিকিৎসায় ব্যবহার করেছেন (আবু দাউদ ৩৮৮৫)। অল্প যমযম বা বৃষ্টির পানি থাকলে বরকতের জন্য তা সাধারণ পানির সাথে মিশিয়ে নিতে পারেন।
- অলিভ অয়েল, ১০০ মিলি। কুরআনে যাইতুনের তেলকে বরকতময় বলা হয়েছে (আন-নূর ২৪:৩৫)। ফিলিস্তিনের এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল সবচেয়ে ভালো; না পেলে শরীরে মাখার উপযোগী ভালো মানের যেকোনো অলিভ অয়েল।
- মধু, ২৫০ গ্রাম। আল্লাহ জানিয়েছেন, মধুতে মানুষের জন্য আরোগ্য আছে (আন-নাহল ১৬:৬৯)। যতটা সম্ভব খাঁটি মধু নিন: পরিচিত কারও মাধ্যমে, নির্ভরযোগ্য অনলাইন দোকান থেকে, অথবা ভালো কোনো ব্র্যান্ডের।
- কালোজিরা, ৫০ গ্রাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মৃত্যু ছাড়া সব রোগের আরোগ্য কালোজিরায় আছে (তিরমিযী ২০৪১)। ভালো মানের কালোজিরা নিন এবং সম্ভব হলে ব্যবহারের আগে ময়লা বেছে ফেলুন।
- তিলাওয়াতের জন্য কুরআন শরীফ। কুরআনে মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত রয়েছে (আল-ইসরা ১৭:৮২)।
একসাথে এত পানি রাখার ব্যবস্থা না থাকলে প্রথমে ২ লিটার প্রস্তুত করুন, শেষ হয়ে গেলে আবার প্রস্তুত করুন। তবে রুকইয়াহ পড়া পানির সাথে পরে নতুন (না-পড়া) পানি মেশাবেন না।
প্রস্তুতকরণ: উপকরণে রুকইয়াহ পড়া
পানি, তেল, মধু ও কালোজিরা হাতের কাছে খোলা রেখে নিচের সূরা ও আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে চারটি উপকরণেই ফুঁ দিতে থাকুন।
- সূরা আল-ফাতিহা: ৭ বার, অথবা ৩ বার। সূরা আল-ফাতিহা: সর্বোত্তম দোয়া
- আয়াতুল কুরসী: ৭ বার, অথবা ৩ বার। আয়াতুল কুরসী
- সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস: প্রতিটি ৩ বার করে। তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস
- সম্পূর্ণ সূরা আল-বাকারা একবার। (সূরা আল-বাকারা (২))
- শেষে আয়াতে শিফা এবং শারীরিক অসুস্থতার রুকইয়াহর কিছু দোয়া (নিচে দেওয়া হলো)। চাইলে রুকইয়াহর আয়াতের তালিকা-র শেষে দেওয়া দোয়াগুলোও পড়তে পারেন।
সূরা বাকারা এক বসায় শেষ করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একবারে যতটুকু পারেন পড়ুন, কাজ থাকলে উঠে যান, ফিরে এসে বাকিটা পড়ুন। দরকার হলে দুই দিন সময় নিয়ে প্রস্তুতি শেষ করুন, তারপর ডিটক্স শুরু করুন।
শেষে যে আয়াত ও দোয়া পড়বেন
আয়াতে শিফা: আত-তাওবা ৯:১৪, ইউনুস ১০:৫৭–৫৮, আন-নাহল ১৬:৬৯, আল-ইসরা ১৭:৮১–৮২, আশ-শু‘আরা ২৬:৮০, ফুসসিলাত ৪১:৪৪।
শারীরিক অসুস্থতার রুকইয়াহয় বইয়ে উল্লেখিত দোয়া:
- আল্লাহুম্মা রব্বান নাস: অসুস্থের জন্য রুকইয়াহ
- জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি আরকীক
- জিবরাঈল (আ.)-এর রুকইয়াহ: বিসমিল্লাহি ইউবরীক
- শরীরে ব্যথা হলে: প্রথমে “বিসমিল্লাহ” ৩ বার, তারপর দোয়াটি ৭ বার।
- রোগীর সুস্থতার জন্য ৭ বার: ৭ বার।
- নবীদের দোয়া: আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া, মূসা (আ.)-এর দোয়া: রিযিক ও কল্যাণের প্রয়োজনে, দোয়া ইউনুস
কেন এই সূরাগুলো
সূরা বাকারা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এটি গ্রহণ করা বরকত, ছেড়ে দেওয়া আফসোস, আর বাতিলপন্থীরা (অর্থাৎ জাদুকররা) এর মোকাবিলা করতে পারে না (মুসলিম, আবু উমামা বাহিলি (রা.) থেকে)। সূরা ফাতিহাকে তিনি সত্য রুকইয়াহ বলেছেন (আবু দাউদ), আর যে সাহাবী ফাতিহা পড়ে রুকইয়াহ করেছিলেন তাঁকে বলেছেন, “তুমি কীভাবে জানলে এটা রুকইয়াহ?” (বুখারী)। আয়াতুল কুরসী কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত (মুসলিম) এবং শয়তান থেকে হেফাযতের মাধ্যম (বুখারী)। আর সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের এবং অন্যদের রুকইয়াহ করেছেন (বুখারী)।
এই ধাপগুলো ঠিকঠাক শেষ হলে আপনি সাত দিনের ডিটক্স শুরু করার জন্য প্রস্তুত।
কীভাবে ব্যবহার করবেন
প্রোগ্রাম শুরু হয় প্রথম রাতে ঘুমের আগে, আর শেষ হয় সপ্তম দিনের গোসলের মাধ্যমে। অর্থাৎ মোট সাত রাত ও সাত সকাল।
প্রতি রাতে, ঘুমের আগে
- তেল মাখুন। প্রথম তিন রাত (১ম–৩য়) মাথার তালু থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত পুরো শরীরে রুকইয়াহর অলিভ অয়েল মাখুন। পরের চার রাত (৪র্থ–৭ম) শুধু শরীরের যেসব জায়গায় ব্যথা বা সমস্যা আছে, সেখানে মাখুন।
- ৭টি কালোজিরা চিবিয়ে খান।
- মধু-পানি পান করুন: আধা গ্লাস (১২০–১২৫ মিলি) রুকইয়াহর পানিতে এক চা-চামচ মধু গুলিয়ে খেয়ে ফেলুন।
প্রতিদিন সকালে
- গোসল করুন, যতটা সম্ভব সকাল সকাল। গোসলের পানিতে আগে এক গ্লাস (প্রায় ২২০ মিলি, অর্থাৎ এক পোয়া) রুকইয়াহর পানি মিশিয়ে নিন, তারপর সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করুন।
- গোসলের পর আবার ৭টি কালোজিরা চিবিয়ে খান।
- তারপর আবার আধা গ্লাস রুকইয়াহর পানিতে এক চা-চামচ মধু গুলিয়ে পান করুন।
দিনের যেকোনো সময়
সুস্থতার নিয়তে কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শুনুন। অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে নিজের সমস্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট রুকইয়াহও শুনতে পারেন। বইয়ে প্রথম তিন দিনের রুটিনে এটি রাখা হয়েছে; তবে ডিটক্সের সাথে প্রতিদিন রুকইয়াহ শোনা বাধ্যতামূলক নয়, শুনতে পারলে উপকার বেশি। অডিও বাছাইয়ে সতর্ক থাকুন: যাচাই না করে ইউটিউব থেকে যেকোনো “রুকইয়াহ” শুনবেন না, কারণ সেখানে শিরকি ও বিদআতি অডিওও আছে।
এক নজরে সাত দিন
- ১ম–৩য় রাত: পুরো শরীরে তেল → ৭টি কালোজিরা → আধা গ্লাস মধু-পানি।
- ৪র্থ–৭ম রাত: শুধু ব্যথা বা সমস্যার জায়গায় তেল → ৭টি কালোজিরা → আধা গ্লাস মধু-পানি।
- ১ম–৭ম সকাল: এক গ্লাস রুকইয়াহর পানি মেশানো পানিতে গোসল → ৭টি কালোজিরা → আধা গ্লাস মধু-পানি।
- সারা সপ্তাহ: সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের মাসনূন আমল, বেশি বেশি ইস্তিগফার, সুস্থতার জন্য দোয়া; সম্ভব হলে কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শোনা।
আমাদের হিসাবে, সাত দিনে পান করবেন প্রায় ১.৭ লিটার এবং গোসলে মেশাবেন প্রায় ১.৫ লিটার রুকইয়াহর পানি; কালোজিরা লাগবে ৯৮টি দানা, মধু ১৪ চা-চামচ। তাই সাড়ে তিন থেকে চার লিটার পানি প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
এই সাত দিনে কী আশা করবেন
- প্রথম দিন হয়তো তেমন কিছু টের পাবেন না।
- দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন সমস্যা বাড়তে পারে: খুব দুর্বল লাগা, শরীরের নানা জায়গায় ব্যথা, মেজাজ খিটখিটে থাকা ইত্যাদি। কারও ক্ষেত্রে এসব প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে পঞ্চম দিন পর্যন্ত চলতে পারে। আবার সবার ক্ষেত্রে এমন হবেই, তা-ও নয়।
- সাধারণত চতুর্থ বা পঞ্চম দিন থেকে কষ্ট কমতে থাকে, আর সাত দিন শেষে অনেকটা সুস্থ বোধ করার আশা করা যায়, ইন শা আল্লাহ।
শুরুর দিকে কষ্ট বেড়ে যাওয়া রুকইয়াহর পরিচিত প্রতিক্রিয়া, এতে ঘাবড়াবেন না। কীভাবে সামলাবেন, জানতে পড়ুন রুকইয়াহর পর প্রতিক্রিয়া, দেরি ও শেষ বোঝা। তবে তীব্র ব্যথা, উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো জরুরি উপসর্গকে “প্রতিক্রিয়া” ভেবে বসে থাকবেন না; দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান।
সাত দিন পরও যথেষ্ট উন্নতি না হলে টানা কয়েক মাস সার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রাম অনুসরণ করুন, অথবা অভিজ্ঞ কারও সাথে পরামর্শ করে নির্দিষ্ট সমস্যার রুকইয়াহ করুন। নিজে নিজে অনুমান করে চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আরও কিছু নিয়ম
- কালোজিরা চিবাতে কষ্ট হলে মধু-পানির শরবতের সাথে গুলিয়ে নিন, অথবা গুঁড়া করে খান।
- খুব ছোট শিশুর ডিটক্সে মধু বাদ দিন বা খুবই সামান্য দিন। পানি বেশি খেতে না চাইলে পরিমাণ অর্ধেক করুন, আর কালোজিরা গুঁড়া করে একসাথে গুলিয়ে খাওয়ান। চিকিৎসকদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু একেবারেই দেবেন না। শিশুদের বিষয়ে আরও দেখুন শিশুদের রুকইয়াহ।
- রোজা রেখে ডিটক্স করলে সকালের মধু-পানি ও কালোজিরা সাহরির শেষ দিকে খান, গোসল দিনের বেলায় করুন, আর রাতের রুটিন স্বাভাবিক নিয়মে পালন করুন।
- শীতকালে সকালে গোসল করতে কষ্ট হলে হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন; একান্ত না পারলে একটু দেরিতে গোসল করলেও সমস্যা নেই।
- পিরিয়ডের সময়ও মেয়েরা ডিটক্স করতে পারবেন, যদি উপকরণ আগে থেকে প্রস্তুত থাকে বা অন্য কেউ পড়ে প্রস্তুত করে দেন।
- সপ্তাহ শেষে বেঁচে যাওয়া উপকরণ দিয়ে পরে আবার ডিটক্স করা যায়, অথবা স্বাভাবিক কাজে ব্যবহার করা যায়।
- পুরো সপ্তাহ বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন, প্রতিদিনের মাসনূন আমল চালিয়ে যান, আর মুক্তি ও সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
- একটি ডায়েরি বা খাতা রাখুন। প্রতিদিনের অবস্থা খুব সংক্ষেপে লিখে রাখুন, যেন সপ্তাহ শেষে অভিজ্ঞ কাউকে পরিষ্কারভাবে জানাতে পারেন।
- কত ঘন ঘন করবেন: পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রামে মাসে এক বার (সমস্যা বেশি হলে দুই বার) এই ডিটক্স করতে বলা হয়েছে, দুইবারের মাঝে এক থেকে দেড় সপ্তাহ বিরতি রেখে। বিরতি ছাড়া টানা ডিটক্স করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
যা থেকে দূরে থাকবেন
ডিটক্সের সময় শরীরে বা ঘরে কোনো তাবিজ-কবচ রাখবেন না; থাকলে শরীয়তসম্মত নিয়মে নষ্ট করুন (দেখুন জাদু: লক্ষণ ও সাধারণ রুকইয়াহ)। কবিরাজ বা তান্ত্রিকের দেওয়া “পড়া” পানি, তেল বা অন্য কিছু ব্যবহার করবেন না। মনে রাখবেন, আরোগ্য দেন একমাত্র আল্লাহ; পানি, তেল, মধু বা কালোজিরার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, এগুলো কেবল মাধ্যম।
সূত্র: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, রুকইয়াহ (পৃ. ২৩৮–২৪৩, ২৪৫), এবং রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি (ruqyahbd.org)। বিস্তারিত জানতে মূল বইটি পড়ুন।